তোমার স্মৃতির ডায়রি

WriterBD / ২৫২ বার পঠিত
আপডেট : বুধবার, ৬ জানুয়ারি, ২০২১
Picture- writerbd

আমি: আজ তুমি চলে গেলে। মন চাইলেও তোমার ঐ মুখখানা আমি দেখতে পাবো না। কারণ তুমি ঘুমাচ্ছো। এই ঘুম আর কখনোই ভাঙবে না। তবে, আমিও আসতে চাই তোমার কাছে। হয়তো খুব শীঘ্রই আমারও ডাক পড়বে। তখন তুমি আর আমি আবারও একসাথে থাকতে পারবো। আমাদের এই বিচ্ছেদ সাময়িক সময়ের বিচ্ছেদ। আবার আমরা মিলিত হবো। আমাদের পুনঃমিলন হবে।

ভিডিও দেখতে ক্লিক করুন

(বন্ধুরা, এখন কার সাথে কথা বললাম, আশা করি তা একটু হলেও বুঝতে পেরেছেন। আমি আমার স্ত্রীর সাথে কথা বলছিলাম। ওর নাম ফিরোজা। ওর কবরের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে ওর সাথে কথা বলছি। তবে শুধু আমিই কথা বলে যাচ্ছি। ফিরোজা একটি কথাও বলেছে না। মারা যাওয়ার আগে ও বলেছিল, আমি যেন প্রতিদিন ওর কবরের সামনে গিয়ে ওর সাথে কথা বলে আসি। তাই আমি আজকে এসেছি ওর সাথে কথা বলতে। যে কটা দিন বাঁচি ওকে দেওয়া কথা রাখতেই হবে। প্রতিদিন ফিরোজার  কবরের সামনে এসে, ওর সাথে কথা বলতে হবে। আমারও অনেক বয়স হয়েছে। আমিও বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছি। আমরা একসাথে ৪০ বছর সংসার করেছি। চলুন আপনাদের ৪০ বছর আগে ফিরিয়ে নিয়ে যাই। তখন আমার বয়স ছিল কুড়ি বছর। আর ফিরোজার ছিল ১২ । ফিরোজাকে দেখতে গিয়েছিলাম,,,,)

আমার বাবা: কৈ‌, এবার পাত্রীকে নিয়ে আসুন। বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে। আমাদের আবার বাড়িতে ফিরতে হবে।

(ফিরোজের বাবা ফিরোজাকে নিয়ে আসতে বললেন। ফিরোজার মা ওকে নিয়ে রুমে প্রবেশ করলো। ছিপছিপে ছিল ফিরোজা। কারণ বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর। তবে মুখের অবয়বটা অনেক সুন্দর ছিল। ঘটকের সেদিকে কোন খেয়াল ছিল না। ও বেচারা খাওয়া নিয়ে ব্যস্ত ছিল। আমি অবশ্য লুকিয়ে লুকিয়ে এক নজর দেখেছিলাম। একবার দেখেই ফিরোজাকে অনেক ভালো লেগে যায়। বাবা ফিরোজাকে ওকে করলেন ,,,,,)

আমার বাবা: মা, তোমার নাম কি?

তুমি: ফি ,ফি , ফিরোজা।

আমার বাবা: তুমি কোন ক্লাস পর্যন্ত পড়ালেখা করেছো?

তুমি: কা, কা,  ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়েছি।

আমার বাবা: তুমি কি কি রান্না করতে পারো?

তুমি: আ, আ, আমি রান্না করতে পারি না

আমার বাবা: তুমি কোরান শরীফ পড়তে পারো?

তুমি: হ্যাঁ, না, মানে , এটাও পারিনা।

আমার বাবা: তাহলে তুমি কি কি করতে পারো?

তুমি: আমি না, কিছুই করতে পারিনা।

(দেখলাম ফিরোজা অনেক কাঁপছে। এরপর ও একদম অজ্ঞান হয়ে গেল। হাহাহা।  ওর বাবা- মা ,ওকে ধরে নিয়ে ভিতরে গেল। এমন দৃশ্য দেখে সবাই হেঁসে দিয়েছিল। আমি নিজেও অনেক লজ্জা পাচ্ছিলাম। আগেকার যুগে আমাদের পছন্দকে খুব একটা  প্রাধান্য দেওয়া হতো না। বাবার ফিরোজাকে খুব পছন্দ হয়েছিল। তাই তিনি বিয়েটা ঠিক করলেন। শুনুন এবার বাসর ঘরের কাহিনী। আমি ঘরে প্রবেশ করলাম,,,,)

আমি:এই ফিরোজা, কি করছো তুমি?

(দেখলাম ফিরোজার কোন সাড়াশব্দ নেই। ও চুপচাপ বসে আছে। আমি আবারো ওর কাছে গিয়ে ডাকলাম)

আমি: এই ফিরোজা! ঘোমটা টা তোলো।

(এরপরেও কোন সাড়া শব্দ পেলাম না। আমি তো রীতিমত ভয় পেতে থাকলাম। ভাবলাম, আজকেও আবার বসে থেকেই ও অজ্ঞান হয়ে যায়নি তো! যাইহোক, আমি নিজেই ওর ঘোমটা টা তুলে দিলাম। এরপর দেখি ও বসে বসে ঘুমাচ্ছে। হাহাহা। তারপর ওকে ভালো করে শুইয়ে দিলাম। ফিরোজা ঘুমাচ্ছে। নিষ্পাপ ওর মুখে সেদিন অনেকক্ষণ ধরে চেয়েছিলাম। পৃথিবীতে আমাদের সম্পর্ক কেমন তাইনা! একদিন আগেও যাকে আমি ভালো করে চিনতাম না। এখন সে আমার সহধর্মিনী। আমার অর্ধাঙ্গিনী। স্রষ্টা ওর প্রতি অন্যরকম একটা মায়া সৃষ্টি করে দিয়েছেন। যাহোক  আমিও একটু পরে ঘুমিয়ে পরলাম। বিয়ের পরের দিন সকালের কথা,,,)

আমি: এই ফিরোজা, ঘুম থেকে ওঠো। অনেক সকাল হয়ে গেছে। জলদি উঠে পড়ো।

তুমি: বাবা,আর একটু ঘুমাতে দাও। অনেক ক্লান্ত লাগছে।

(হাহাহা। ফিরোজা ঘুমের ঘোরে আমাকে কি বলে ডাকছে দেখুন ! ও ভুলেই গেছে, ওর বিয়ে হয়ে গেছে। যাই হোক আমি আর ওকে ডিস্টার্ব করলাম না। আমি ঘর থেকে বাহিরে চলে আসলাম। কিছুক্ষণ পর দেখি ফিরোজা উঠে আসলো। এসে চুপচাপ আমার পাশে বসলো।)

তুমি: আচ্ছা, আমি বাড়ি যাবো কবে?

আমি: এখন থেকে এটাই তোমার বাড়ি। এখানেই তোমাকে থাকতে হবে।

তুমি: তা কি করে হয়। বাবা যে বললেন, আমাকে পুতুলের মতোই বিয়ে দিচ্ছেন। পুতুল খেলার মতো বিয়ে শেষ হয়ে গেলে আবারো আমি বাবার কাছে যেতে পারবো।

(ফিরোজার ছোট মনটা তখন সংসার সম্পর্কে কিছুই জানতো না। তখনো ফিরোজা পুতুল নিয়ে খেলতো। আর এই ছোট বয়সেই আমার সাথে ওর বিয়ে হয়েছে। কিন্তু বিয়ে সম্পর্কে ফিরোজের কোন ধারনাই ছিল না। সংসার কি, সে সম্পর্কে ফিরোজা কিছুই জানতো না।)

আমি: কালকেই তোমাকে তোমার বাবার বাড়িতে নিয়ে যাবো। আজকের দিনটা আমাদের বাড়ীতেই তোমাকে থাকতে হবে।

তুমি: না, আমি আজকেই বাড়ি যাবো। এখানে আমার ভালো লাগছে না। আমি কাউকেই চিনিনা। বাবা- মাকে ছাড়া এখানে থাকবো কেমন করে? আমি বাবা মায়ের কাছে যাবো।

আমি: তোমাকে তোমার বাবা-মায়ের কাছেই নিয়ে যাবো। শুধু একটা দিন দেরি করো। কালকেই নিয়ে যাবো।

তুমি: আচ্ছা ঠিক আছে। আপনি খুব ভালো। আপনি আমার সাথে পুতুল খেলবেন তো?

(হাহাহা। আমার বউয়ের অবুঝ মনটা সত্যি কিছুই বোঝেনা। এখনো ওর পুতুল খেলার বয়স শেষ হয়নি। এখনকার যুগের মতো তো আর স্মার্টফোন ছিল না, তাই আগেকার যুগে পুতুল নিয়েই মেয়েরা খেলতো। আর বর্তমান যুগের মতো আগেকার যুগের ছেলে মেয়েরা অকালপক্ক ছিল  না। আমি ফিরোজাকে বললাম,,) 

আমি: হ্যাঁ ,আমি তোমার সাথে পুতুল খেলবো, তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে দেবো। তোমার চুল বেঁধে দেবো।

তুমি: আমার এখানে কেমন যেন লাগছে। সবাই অপরিচিত। আমাকে কি এখানেই থাকতে হবে

আমি: হ্যাঁ এখন থেকে তোমাকে এখানেই থাকতে হবে। তবে কালকেই তোমাকে তোমার বাবা-মায়ের কাছে নিয়ে যাবো।

(এভাবেই সেদিনটা পার হলো। পরেরদিন শ্বশুর বাড়িতে গেলাম আমার বউকে নিয়ে। এখানে কয়েকটি মজার কাহিনী ঘটলো। শশুর বাড়িতে যাওয়ার পরে একদিন সেখানে ছিলাম। কিন্তু রাতের বেলা আমি ঘরে একা শুয়ে আছি। ফিরোজাকে খুঁজে পেলাম না। তাই ফিরোজাকে ডাকলাম,,,)

আমি: এই ফিরোজা কোথায় তুমি?

(একথা বলতেই দেখলাম ফিরোজা বের হয়ে এলো। আমার রুমে আসলো। ও কি বললো জানেন,,,,!!!)

তুমি: ডাকছেন কেন, বলুন ?

আমি: রাত তো অনেক হলো। এবার তো ঘুমোতে হবে। তো শুয়ে পড়ো

তুমি: হুম, ঘুমোতে তো হবেই। আপনি আপনার মতো শুয়ে পড়ুন। আমি মায়ের কাছে ঘুমাবো।

আমি: আরে তোমার তো বিয়ে হয়েছে। আমি থাকতে, তুমি তোমার মায়ের কাছে ঘুমাবে কেন?

তুমি: আমি মায়ের কাছে ঘুমাবো। মাকে ছাড়া আমার ঘুম আসেনা।

(কথাটা ফিরোজার বাবা শুনতে পেল।  তিনি ফিরোজাকে রাগ দেখিয়ে আমার সাথে বললেন। আমি শুধু নীরব দর্শক হয়ে মজা নিচ্ছিলাম। এরপর দেখলাম ফিরোজা চুপচাপ আমার পাশে এসে শুয়ে পড়লো। আসলে ওর কোন দোষ নেই। ওর তো বাচ্চা মন। রাত শেষ হয়ে সকাল হয়ে আসলো। ফিরোজার সাথে ওর বান্ধবীরা দেখা করতে এসেছে। একজনের বয়স ১০ বছর, আরেকজনের ১২ , আরেকজনের ১৪। ফিরোজা ওদের দেখেই পুতুল খেলতে চাইলো। আমি চুপচাপ হেসেই চলেছি। সেদিন বাসায় ফিরতে হবে।)

আমি: আজকে তো বাসায় ফিরতে হবে। জলদি রেডি হয়ে নাও।

তুমি: আমি মাকে ছাড়া কোথাও যাবো না। ঐ বাড়িতে আমার একটুকুও ভালো লাগেনা।

আমি: এখন তো ওটাই তোমার বাড়ি। তোমাকে তো যেতেই হবে।

তুমি: না, আমি যাবো না ‌।

(কথাটা ফিরোজার মা শুনতে পেল। তিনি অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে ফিরোজাকে আমাদের বাসায় পাঠালেন। এরপর থেকে অনেক কয়দিন যাবৎ ফিরোজা মন খারাপ করে থাকতো। তবে মাঝে মাঝেই ওকে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে যেতাম। তখন ওর চোখে  মুখে খুশির বন্যা বয়ে যেত। এভাবেই আমাদের দিনকাল চলতে থাকলো। তবে আমি স্বামীর অধিকার নিয়ে ওর কাছে কোনদিনও যায়নি। স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক বোঝার মতো ক্ষমতা ওর তখনো হয়নি।  বৈশাখ মাসে এক রাতের বেলা কি হয়েছিল শুনুন। অনেক ঝড় হচ্ছিল।)

তুমি: আমার খুব ভয় করছে।

(এই বলে ও আমার বুকের মাঝে লুকিয়ে পড়লো।)

আমি: আমি আছি তো। তোমার কোন ভয় নেই। তুমি চুপচাপ ঘুম দাও।

(হঠাৎ বিকট শব্দে মেঘ গর্জে উঠলো। আর ও আমাকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।)

আমি: এই কিছু হয়নি তো। আমিতো আছি। আমি থাকতে তোমার কোন ভয় নেই।

(কিছুক্ষণ পরে ঝড় থেমে গেল। তখন ও চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়লো। এভাবেই আরো কয়েকটা দিন পার হয়ে গেল। একদিন আমার রাতের বেলা বাসায় ফিরতে দেরি হয়েছিল। শুনুন, ও কি কাণ্ডটা করেছে। ফিরোজা আমার মায়ের কাছে শুয়ে পড়েছিল। আমার বাবা রুমে ঢুকে দেখে আমার মায়ের পাশে ফিরোজা শুয়ে আছে। এই অবস্থা দেখে, আমার বাবা প্রায় তিন ঘন্টার মতো ঘরের বারান্দায় বসে ছিল। এভাবেই অনেক হাসি খুশিতে আমাদের দিন কেটে যাচ্ছিল। একদিন আমার বাবা বললেন,,,)

আমার বাবা: বিয়ের তো অনেকদিন হলো। এখনো পর্যন্ত কোনো সুসংবাদ পেলাম না। ব্যাপার কি!

আমি: বাবা ও তো এখনো অনেক ছোট। সংসার কী জিনিস সেটাই ও ভালোমতো বোঝেনা। আর এগুলো বিষয় আরোই বুঝবে না।

(আমার বাবা সেদিন আমার কথাতে একটু রাগ করেছিলেন। তবে আমি সবকিছু বুঝিয়ে বলেছিলাম। তিনি আর পরে জোর করেননি। এভাবে আরো তিনটা বছর কেটে গেল। ফিরোজার বয়স ১৫ বছর হয়ে গেল। তবে মানুষ অনেক কিছুই উল্টাপাল্টা বলাবলি করতো। বিষয় গুলো ফিরোজা এখন বুঝতো। তাই অবশেষে আমাদের মাঝে সবকিছু হয়েই গেল। বছর খানিক পরে আমাদের ঘর আলো করে একটা পুত্রসন্তান জন্ম নিল। তখন ফিরোজা একজন আদর্শ নারী হয়ে উঠলো। এভাবে কেটে গেল আরো অনেকগুলো বছর। কিছুদিন আগে ফিরোজার ব্রেইন টিউমার ধরা পড়েছিল। ডাক্তার বলেছিল ও আর বেশীদিন বাঁচবে না। তখন আমি ফিরোজার কাছে গিয়ে বসলাম,,,)

তুমি: আমি সবকিছু জানি। আমি জানি আমার ব্রেইন টিউমার হয়েছে। আমি আর বেশি দিন বাঁচবো না।

আমি: তোমার কিচ্ছু হবে না। ভালো করে চিকিৎসা করালে তুমি সুস্থ হয়ে উঠবে।

তুমি: কেন তুমি মিথ্যে সান্ত্বনা দিচ্ছো। আমিতো জানি আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে। আমার একটা কথা রাখবে?

তুমি: বলো।

তুমি: আমি মারা যাওয়ার পরে, প্রতিদিন আমার কবরের সামনে আসবে। আমার সাথে কথা বলবে।

(আমার চোখের জল অঝরে ঝরে পড়ছিল। চোখের জল পরা বন্ধ হচ্ছিল না। নিজের অজান্তেই ঝড়ে পড়ছিল। এর কিছুদিন পরেই ফিরোজা আমাকে ছেড়ে একাই রওনা দিল মহাকালের পথে। তাই আজও আমি প্রতিদিন ওর কবরের সামনে আসি। ওর সাথে কথা বলি। আমি বুঝতে পারি কবরে শুরু থেকেই ও আমার সাথে কথা বলছে। লোকে আমাকে পাগল বলে। কিন্তু তারা তো আমার কষ্টটা জানেনা। জানেনা আমার ফিরোজার সম্পর্কে। আর যে কয়টা দিন বাঁচবো প্রতিদিন এভাবেই ফিরোজার সাথে কথা বলবো। লোকে অনেক কিছুই বলে এবং ভবিষ্যতেও বলবে।

তবে,মে তাই বলুক না কেন, আমার ভালোবাসার মানুষটির কাছে থেকে আমি দূরে সরে থাকতে পারিনা। আমিও আর কিছুদিন পরেই হয়তো ওর কাছে চলে যাবে। কারণ যেতে আমাকে হবেই।


এ জাতীয় আরো ..