ফেসবুক

WriterBD / ৯৬ বার পঠিত
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ৭ জানুয়ারি, ২০২১

মিসেস সেনকে আমি দুচোক্ষে সহ্য করতে পারিনা। ওনার সাথে কথা বলাটা আমার কাছে কমপ্লিটলি ওয়েস্ট অফ টাইম মনে হয়। তবু ওনার সাথে আমাকে কথা বলতে হয়। ওনার কল এলে হাসি মুখে আমাকে কলটা রিসিভ করে সৌজন্যতা দেখাতে হয়।
একটু আগের থেকে ঘটনাটা বলি বরং। মিসেস সেন, ওরফে জয়ীতা সেনের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টটা পেয়ে আমি প্রথমেই ওনার প্রোফাইলটা ঘেটে দেখে নিয়েছিলাম৷ বস্তুত ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করার আগে কম বেশী সবার প্রোফাইল আমি ঘাটাঘাটি করে এক আঁধবার চেক করে নেই। মিসেস সেনও ব্যতিক্রম নন।
মিসেস সেনের বয়স ষাটের ওপর। প্রোফাইল ফটোতে ওনার সদা হাস্যমুখের একখানা ছবি। ফ্রেন্ডলিস্টে খুব মেরে কেটে হলেও জনা কুড়ি মতো ফ্রেন্ড। বয়স্কো লোকদের প্রোফাইল যেরকম হয়, ওনার প্রোফাইলও সেরকমই। ঠাকুর দেবতা নিয়ে পোস্ট; এছাড়া গুড মর্নিং, শুভরাত্রি জাতীয় গুচ্ছের পোস্ট; মাঝে সাঝে এক আধটা পুরোনো দিনের গান শেয়ার করা। অনিচ্ছা সত্ত্বেও অ্যাকসেপ্ট করেছিলাম ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টটা।
ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করার পর পর মাঝেমধ্যেই ওনার গুডমর্নিং গুডনাইট এসব ম্যাসেজ আসতো। জবা ফুলের ফটোতে সুপ্রভাত লেখা কিংবা লোকনাথ বাবার ফটোর মধ্যে শুভরাত্রি- এই জাতীয় সব ম্যাসেজ। আমি দেখেও রিপ্লাই করতাম না। কিন্তু একদিন রিপ্লাই করতে হলো; খানিকটা ভদ্রতার খাতিরেই। সেদিন জন্মদিন ছিলো আমার। ভদ্রমহিলা আমাকে ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে বেশ গুছিয়ে লিখে উইশ করেছেন দেখলাম। ভেতর ভেতর একটু খারাপ লাগলো। এতো বয়স্কো একজন… প্রতি উত্তরে “ধন্যবাদ” লিখলাম। সেই থেকে আমাদের আলাপ পরিচয় শুরু৷ ভদ্রমহিলা বেশ বাক্যবাগীশ। পাশাপাশি বেশ মিষ্টভাষী। খুব সুন্দর গুছিয়ে কথা বলতে পারেন। আমি ওনার ছেলের বয়সী প্রায়। আমাকে উনি বেটা ডাকতেন। ধীরে ধীরে পরিচয় বাড়লো। একসময় আমি ওনাকে আমার ফোন নম্বর দিলাম। আর সেটাই হলো সর্বনাশ। সময় নাই, অসময় নাই, ভদ্রমহিলার ফোন আসতে শুরু করলো আমার মোবাইলে। বিশেষ কোনো কারন নেই। অকারনেই তিনি কল করতে লাগলেন। একটা সময়ে বেশ বিরক্ত হলাম বটে। কিন্তু মায়ের বয়সী একজনকে মুখে খারাপ ভাবে কিছু বলতে পারলাম না। আর নিজের বিরক্তি ওনার কাছে প্রকাশ না করতে পারার আরেকটা কারন ভদ্রমহিলা বাচনভঙ্গি। এতো গুছিয়ে সুন্দর করে কথা বলেন, ওনার কথার প্রত্যুত্তরে খারাপ ব্যাবহার করে ওনাকে ইগনোর করা এককথায় অসম্ভব।
একদিন অনলাইনে পরীক্ষা দিচ্ছিলাম। ঠিক ওই সময় ভদ্রমহিলার ফোন। বিনয়ী গলায় জিজ্ঞেস করলেন- “হ্যালো বেটা… ব্যস্ত আছো? একটু দরকার ছিলো।”
আমি জানি, ওনার আমার সাথে আসলে কোনো দরকারই নেই। এই কথাটা উনি প্রত্যেকবার ফোন করলে প্রথমেই বলে নেন।
উত্তরে বললাম-“না না বলুন আন্টি…”
-“কী করছিলে?”
-“এই পড়ছিলাম একটু।”
আমার এই কথাটা শুনেই ওনার বোঝা উচিত ছিলো আমি এখন কথা বলতে পারবো না ওনার সাথে। কিন্তু উনি বুঝলেন না। ওনার নিজের কথা বলে চললেন।
-“জানো আমার নাতি আমার জন্য একটা ছবি এঁকেছে। আমার ছেলেরা তো ক্যালিফোর্নিয়া থাকে। এখানে সেরকম আসা হয়না। ছেলে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠালো সেদিন নাতির আঁকা ছবিটা। দু বছরের বাচ্চা, কিন্তু কী সুন্দর এঁকেছে জানো! আমি তোমাকে ছবিটা হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাবো। দেখে জানিয়ো!”
আমি অবহেলার সাথে উত্তর দেই-“আচ্ছা।”
এটুকু বলেও উনি থামেন না। নিজের মতো বলে চলেন দেশ রাজ্য পরিস্থিতির কথা। আমি শুনি। বেশীরভাগ কথার কোনো উত্তর দেই না। কোনো কোনো কথার “হুম, ওহ, আচ্ছা” গোছের দায়সারা উত্তর দেই। এরকম করে প্রায় কুড়ি পঁচিশ মিনিট একনাগাড়ে বকবক করার পর উনি ফোন ছাড়েন। কিছুটা স্বস্তি হয়।
আরেকদিন খেতে বসেছি, তখনই ওনার ফোন-“হ্যালো বেটা, ব্যস্ত আছো? একটু কথা ছিলো!”
-“হ্যাঁ আন্টি বলুন…”
-“কী করছো?”
-“খাচ্ছি, বিশেষ কিছু দরকার থাকলে বলুন, না হলে পরে কথা বলছি!”
এটুকু শুনেও দমে যেতে দেখিনি ওনাকে। উনি শুরু করলেন ওনার রান্নাবান্নার গল্প। ডালের বড়ি দিয়ে শুক্তো রান্না, লাউয়ের সাথে শোল মাছ রান্না। আমি এক কান দিয়ে শুনে আরেক কান দিয়ে বের করে দেই ওসব। ওনার ওসবে ভ্রুক্ষেপ নেই। উনি উৎসাহ নিয়ে বকে চলেন।
এক আধবার একটু বাজে ভাবে রিপ্লাই করে ফোন রেখে দিয়েছি; কোনো কোনো দিন ফোন রিসিভ করিনি; অথচ একবার ফোন না ধরলে বা লাইন কেটে দিলেও উনি সমানে কল করে যান। আমি কোনো দিন কল দেখেও ওনাকে কলব্যাক করিনি। ভেবে রাগ হয়, আচ্ছা উনি কী এতোটাই নির্বোধ? বয়সের সাথে সাথে বোধবুদ্ধির মাথা খেয়েছেন উনি? আমি ব্যস্ত আছি বা ওনার সাথে কথা বলতে চাইছিনা, এই সহজ কথাটা উনি বুঝতে পারছেন না? ওনাকে কখনো বিরক্ত হতে দেখিনি। আমি ফোন রিসিভ না করলেও, উনি আমাকে নিয়মিত দু’বেলা গুডমর্নিং গুডনাইট পাঠান।
সেবার পরীক্ষার চাপ ছিলো। কী একটা অঙ্ক নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। এমন সময় ওনার ফোন। মাথা এমনিতেই গরম ছিলো, তারওপর ওনার ফোনে আমি আগে থেকেই তিতিবিরক্ত ছিলাম। রিসিভ করে ঝাঝালো গলায় ওনাকে দু’চার কথা শুনিয়ে দিলাম-“কোনো কান্ডজ্ঞান নেই আপনার? যখন তখন ফোন! এই বয়সে বোধবুদ্ধি না থাকলে, কিচ্ছু করার নেই! মানুষকে ডিস্টার্ব করতে খুব ভালো লাগে আপনার?”
আশ্চর্য! আমি রেগেমেগে এতোগুলো কথা ওনাকে শোনালাম, ওনার গলার স্বরে প্রত্যুত্তরে কোনো রাগ নেই। শান্ত গলায় বললেন-“বেটা, তুমি হয়তো ঝামেলায় আছো৷ আমি বুঝতে পারিনি। তুমি কাজ করো। আমি পরে কল করবো তোমাকে। আসলে একটু দরকার ছিলো…”
কথা শেষ হওয়ার আগেই বললাম-“না আপনার আমার সাথে কোনো দরকারই নেই। প্লিজ বিরক্ত করবেন না! রাখুন ফোনটা!”
ভদ্রমহিলা আবার শান্ত গলায় বললেন-“বেটা খুব রেগে আছো তুমি… আচ্ছা পরে কথা হবে!”
উনি ফোন রেখে দিলেন। এরপর আর কোনোদিন উনি আমাকে কল বা ম্যাসেজ করেননি। ফেসবুকেও বিশেষ দেখতাম না ওনাকে। একটা সময় ভদ্রমহিলার কথা আমার মাথা থেকে বেরিয়ে গেছিলো।
অনেক মাস বাদে আমি একটা চিঠি পেলাম। খামের ওপর নামটা দেখে চিনতে অসুবিধা হলো না। সেই ভদ্রমহিলা! এতোদিন পর হঠাৎ ওনার কথা মনে পরলো আবার। একটু অবাক হলাম। এতোদিন কোনো কল ম্যাসেজ নেই, হঠাৎ চিঠি! আজকের দিনে কেউ চিঠি লেখে? খামটা খুলে দেখলাম ভেতরে দুটো চিঠি। প্রথম চিঠিটা খুলে পড়া শুরু করলাম। ওতে লেখা-
“নমস্কার, আমি সুচেতন পাকরাশী। জয়ীতা সেনের প্রতিবেশী। জয়ীতা সেন গত আঠাশে ডিসেম্বর সেরিব্রাল স্ট্রোকে মারা যান। মারা যাওয়ার আগে উনি আমাকে এই চিঠিটা দিয়েছিলেন আপনাকে পাঠাতে বলে। আমারই সময় হচ্ছিলো না। তারপর ওনার এই দুর্ঘটনা। একটু দেরী হলেও চিঠিটা পাঠালাম। চিঠি পড়ে উত্তর পাঠানোর কোনো দরকার নেই। আমি শুধু আমার কর্তব্যটা করেছি মাত্র।”
প্রথম চিঠিটা শেষ করে একটু ধাক্কা খেলাম। মিসেস সেন মারা গেছেন! ভেতর ভেতর কেমন একটা অপরাধবোধ কাজ করছিলো। এবার দ্বিতীয় চিঠিটা খুললাম, যেটা মিসেস সেন আমাকে লিখেছেন মারা যাওয়ার আগে। পড়া শুরু করলাম চিঠিটা-

“প্রিয় বেটা,
জানিনা, এখনো রেগে আছো নাকি আমার ওপর। সেদিনের পর আর তোমাকে কল করার বা ম্যাসেজ করার সাহস হয়নি। না তোমার এতে কোনো দোষ নেই। একজন তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকা বয়স্কা মহিলার সাথে তোমাদের জেনারেশনের ছেলে মেয়েদের কথা বলতে ভালো লাগবে না এটাই স্বাভাবিক। আমি বুঝতাম তুমি বিরক্ত হতে। রাগ করতে। তাও তোমাকে কল করতাম। না না তোমার রাগ করা বা বিরক্ত হওয়াতে আমি কিছু মাইন্ড করিনি বেটা। তোমার জায়গায় আমি থাকলে আমিও এমনটাই করতাম। আসলে কী জানো, আমার স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে খুব একা হয়ে পরেছিলাম৷ ছেলেটাও চাকরি নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় গিয়ে ওখানেই সেটেল করে গেলো বউ বাচ্চা নিয়ে। এদিকে বিশেষ আসেটাসে না। সপ্তাহে এক আধবার ফোন করে খোঁজ খবর নেয়। হাঁটুতে অস্টিও আথ্রাইটিসের জন্য বিশেষ বাইরে টাইরে ঘুরতে-টুরতে যাওয়া হয়ে ওঠে না। আর তাছাড়া বাইরে যাবোটাই বা কার সাথে, সেরকম কোনো সঙ্গী সাথী মেই আমার। আগে আমার স্বামী বেঁচে থাকতে… যাক সে কথা। তখনই হুজুগে ফেসবুক খোলা। আসলে তোমাদের বয়সী কোনো ছেলে মেয়ে দেখলেই, কেমন একটা নিজের ছেলের মতো লাগে। আসলে নিজের ছেলেকে তো কাছে পাইনা খুব একটা। মাঝে মাঝে একা লাগলে, দক বন্ধ হয়ে আসতো জানো। তাই তোমাদের একটু কল করতাম। দরকারি কিছুই থাকতো না। শুধু ফোনে একটু কথা বললে মনে হতো অন্তত পাশে কেউ একজন আছে। কথা বলতে পারলে হাল্কা হতাম। বুঝতাম ওপাশের মানুষটা বিরক্ত হচ্ছে হয়তো। তবুও… তোমরা ফোনটা ধরে বিরক্তি চেপে একটু কথা বলতে আমার সাথে, ওইটুকুতেই রিল্যাক্সড ফিল করতাম। যাই হোক, তোমাকে যে কারনে চিঠি লেখা। আর রাগটাগ করে থেকো না বেটা। আমি তো তোমার মায়ের মতোই। মায়েদের ওপর রাগ করে থাকতে hনেই। ভালো থেকো বেটা…”

চিঠিটা শেষ করার পর নিজের অজান্তেই লক্ষ্য করলাম চোখ ভিজে গেছে। একাকীত্ব একটা রোগ। মানুষটা একটু সঙ্গ চেয়েছিলো শুধু। খুব ইচ্ছা করছিলো মিসেস সেনকে একবার কল করি। কল করে একবার অন্তত অনেকক্ষণ ওনার সাথে গল্প করি। কিন্তু সেটা সম্ভব ছিলো না। কারন না ফেরার দেশের টেলিফোন নম্বর আমি জানিনা।

Writer- Mriganka Chakraborty

নতুন গল্প পড়ুন


এ জাতীয় আরো ..