হারা‌নো ভালবাসা

WriterBD / ৮৯ বার পঠিত
আপডেট : শনিবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২১
Picture- pixabay.com

গল্পটির ভিডিও দেখতে ক্লিক করুন

আমার নাম ফয়সাল। হেরে গেছি আমি জীবন যুদ্ধে। এখন আমার এই দেহে শুধু রক্ত মাংসের একটা অবকাঠামো রয়েছে। আমার ভেতরের মানুষটা আজকে মৃত। কেন? তা জানতে চান? চলুন আপনাদের সেই গল্পটি শোনাই।

 ভার্সিটির এডমিশনের জন্য আমি একটি কোচিংয়ে ভর্তি হই। প্রথম দিনেই একটি মেয়েকে খুব পছন্দ হয়ে যায়।

আমি: (কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলছি) হ্যালো, এই যে শুনছেন?

মেয়েটি: জি ভাইয়া, বলুন।

আমি:( ও মাই গড। মেয়েটি ভাইয়া বলেই ডাকলো!) আপনি কি এই কোচিংয়ে ভর্তি হয়েছেন?

মেয়েটি: জি, আমি আজকেই প্রথম এসেছি।

(প্রথম দেখাতেই মেয়েটিকে ভালো লেগে যায়। বলতে পারেন, লাভ এট ফাস্ট সাইট। কোচিংয়ের ক্লাস শেষ করলাম। প্রথমদিনে আর কোন কথা হয়নি।  পরের দিনে আবারো কোচিংয়ে আসলাম)

আমি: কেমন আছেন?

মেয়েটি: ভালো।

আমি: আপনার নামটা জানতে পারি?

মেয়েটি: নাম জেনে কি করবেন?

আমি: তেমন কিছুই নয়। একসাথেই পড়ছি, তাই ভাবলাম পরিচিত হওয়াই ভালো।

মেয়েটি: ওহ, আচ্ছা। আমার নাম শ্রাবণী।

আমি: খুব সুন্দর নাম। আপনি কোথায় থাকেন?

শ্রাবণী: সামনের বাজারটার পাশেই আমার বাসা।

(আস্তে আস্তে দুজনে অনেক পরিচিত হয়ে গেলাম। শ্রাবণী আমার বেস্টফ্রেন্ড হয়ে গেল। আমরা একে অন্যকে তুই করে বলতাম। জানিনা, শ্রাবণী  আমাদের সম্পর্ক নিয়ে কি ভাবতো! তবে আমি শ্রাবণীকে অনেক ভালোবাসতাম।)

আমি: আজকে তোকে আমি একটা কথা বলতে চাই।

শ্রাবণী: একটা কথা বলবি কেন? যতগুলো ইচ্ছা বল।

আমি: হাহাহা। আচ্ছা, চোখ বন্ধ কর তাহলে।

শ্রাবণী: ওকে ।এই নে  চোখ বন্ধ করলাম।

( আমি একটি লালগোলাপ শ্রাবণীকে প্রপোজ করার জন্য নিয়ে এসেছিলাম। যে মুহুর্তে প্রপোজ করতে যাবো, সেই মুহূর্তেই একটা ছেলে শ্রাবণীকে ডাকলো। শ্রাবণী চোখ খুললো। আমি গোলাপটি লুকিয়ে ফেললাম)

ছেলেটি: শ্রাবণী, কি করো এখানে?

শ্রাবণী: ফ্রেন্ডের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম। এ হলো আমার বেস্ট ফ্রেন্ড, শুভ।

শ্রাবণী: শুভ, অনেকদিন ধরে ভাবছিলাম তোকে বলবো, কিন্তু বলাই হয়নি। এই হলো আমার বয়ফ্রেন্ড, আবির।

(মুহূর্তটা আমার কাছে কতোটা কষ্টের ছিল তা মুখের ভাষায় বলে বোঝাতে পারবোনা। আমি ওদের কিছু না বলেই, জায়গাটি ত্যাগ করলাম। রাতে শ্রাবণী কল দিলো। আমি ফোনটা কেটে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। দুইদিন আর কোচিংয়ে যাইনি। অবশেষে দুইদিন পরে কোচিংয়ে গেলাম)

শ্রাবণী: কিরে, তোর কোন খোঁজ-খবর নেই কেন? এই দুই দিন কোথায় ছিলি? আর ফোন রিসিভ করিসনি কেন?

আমি: কোথাও যায়নি। অসুস্থ ছিলাম, তাই বাসা থেকে বের হইনি। আর কারো ফোন রিসিভ করিনি।

শ্রাবণী: সেদিন কি যেন বলছিলি?

আমি: কোন দিন?

শ্রাবণী: আরে 2 দিন আগে, তুই চোখ বন্ধ করতে বললি। হঠাৎ করে, আবির আসার কারণে আর কিছুই তো বললি না।

আমি: তেমন কিছু নয়।

শ্রাবণী: তোর কি মন খারাপ?

আমি: না, আমি ঠিক আছি।

শ্রাবণী: চল, তোকে আজ একটা সারপ্রাইজ দেবো।

আমি: কী সারপ্রাইজ?

শ্রাবণী: আগেই বলে দিলে তো, আর সারপ্রাইজ থাকবেনা। গেলেই দেখতে পাবি।

আমি: আমার সারপ্রাইজ লাগবেনা।

( শ্রাবণী একটা ঘুষি মেরে বললো, তুই যাবি কি না বল? আমি দেখলাম, না গিয়ে উপায় নেই। তাই ওর সাথে সাথে গেলাম।)

শ্রাবণী: চোখটা বন্ধ কর।

আমি: কেন?

শ্রাবণী: এতো কথা বলিস কেন? চোখ বন্ধ করতে বলেছি যখন,  বন্ধ কর।

আমি: ওকে, ঠিক আছে ‌। এই নে ,চোখ বন্ধ করলাম।

(শ্রাবণী আমার হাতটি ধরে, কয়েক ধাপ পেছনে নিয়ে গেল)

শ্রাবণী: এবার চোখ খোল।

(চোখ খুলে, আমি সত্যি আশ্চর্য হয়ে গেলাম। কোচিংয়ের সব বন্ধুরা আমাকে জন্মদিনের উইশ করলো। আমি ভাবতেই পারিনি, শ্রাবণী আমার জন্মদিনের তারিখ জানে।)

শ্রাবণী: হ্যাপি বার্থডে টু ইউ।

আমি: many many thanks.

শ্রাবণী: তোর জন্য আরও একটি সারপ্রাইজ আছে।

আমি: আরো একটি সারপ্রাইজ! কী সেইটা।

শ্রাবণী: তাহলে চোখ বন্ধ কর।

আমি: ওকে। বন্ধ করলাম।

শ্রাবণী: I love you.

(আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। দেখলাম, শ্রাবণী সবার সামনে আমাকে প্রপোজ করলো।)

আমি: কিন্তু, আবির!

শ্রাবণী: আরে গাধা, আবির হচ্ছে আমার স্কুল লাইফের ফ্রেন্ড।তুই আমাকে ভালবাসিস কিনা , তা পরীক্ষা করার জন্যই আবিরকে নিয়ে এসেছিলাম।

(আমি কি বলবো কিছু বুঝতে পারছিলাম না)

শ্রাবণী: প্রপোজের উত্তরটাও কি আমাকে দিতে হবে?

(আমি বুক ভরা শ্বাস নিলাম। হৃদয়ে খুশির বন্যা বয়ে গেল)

আমি: I love you, too. আসলে, সেদিন আমি তোকে প্রপোজ করাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আবির তোর বয়ফ্রেন্ড , একথা শুনে অনেক কষ্ট নিয়ে চলে গিয়েছিলাম।

শ্রাবণী: গাধা একটা।

(এরপরে আমরা দুজনেই ঢাকা ভার্সিটিতে চান্স পাই। শ্রাবণী চান্স পেয়েছিলো ইংরেজি সাহিত্যে, আর আমি অর্থনীতিতে। শ্রাবনীর সাথে কাটানো প্রতিটা দিন আমার কাছে স্বর্গীয় অনুভূতির মতো ছিল।এভাবেই কেটে গেল আরও তিনটি বছর। একদিন শ্রাবণী ফোন করে বললো, খুব জলদি পার্কে দেখা করতে)

আমি: কিরে ,কি হয়েছে?

শ্রাবণী: আমার বাসায়, আমাদের সম্পর্কের বিষয়টি জেনে গেছে। তারা, কোনোভাবেই তোকে মানতে পারবে না। কারণ, তুই এখনো বেকার।

(আমি কিছু না বলে চুপ করে রইলাম)

শ্রাবণী: কিরে ,কিছু তো বল!

আমি: কি আর বলবো বল। এখনো তো আমি চাকরি করি না। অনার্স কমপ্লিট করতে এখনো দুই বছর লাগবে।

শ্রাবণী: তাহলে চল, আমরা পালিয়ে যাই। নইলে জোর করে আবার বিয়ে দিয়ে দেবে।

(আমি মনে মনে ভাবলাম, বাসায় আমার অসুস্থ মা রয়েছে। বাবা নেই। তিনি অনেক আগেই মারা গেছেন। আমার পৃথিবী বলতে, একমাত্র আমার মা। আমি মধ্যবিত্ত। আমি মাকে ছেড়ে কেমন করে, শ্রাবণীকে নিয়ে পালাবো?)

আমি: আমাকে একটু সময় দে। তুই তো সব কিছু জানিস আমার সম্পর্কে।

(এরপর দুজনে বাসায় ফিরে আসলাম। রাতে শ্রাবণীকে ফোন দিলাম।)

শ্রাবণী: আমাকে আর কখনো ফোন দিস না। ভালো থাকিস।

আমি: কেন, কি হয়েছে।

(ফোনটা কেটে গেল। পরেরদিন ইউনিভার্সিটি তে গিয়ে আমি শ্রাবণীকে অনেক খুঁজেছি। কিন্তু তার সাক্ষাৎ পাইনি। শ্রাবনীর বাসার সামনেও গিয়েছিলাম, কিন্তু শ্রাবনীর দেখা পেলাম না।)

(এভাবে কেটে গেল সাতটা দিন। আমি শ্রাবণীর দেখা পেলাম না। হঠাৎ একটা চিঠি আসলো আমার কাছে। কৌতূহলী হয়ে চিঠিটা খুললাম। চিঠিটার প্রতিটা কথা, আমার হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করে দিল। চিঠিটা শ্রাবনীর ছিল। সে সাত দিন আগেই চিঠিটা আমার জন্যই লিখেছিলাম। আমি শ্রাবণীর কথা গুলো পড়লাম)

শ্রাবণী: হয়তো , তোকে এই কথাগুলো আমি ফোনে বলতে পারতাম । কিন্তু নিজেকে হয়তো ধরে রাখতে পারতাম না। তবে বিশ্বাস কর, চিঠিটির প্রতিটা লাইন লিখছি আর আমার চোখ থেকে এক ফোঁটা করে অশ্রু পড়ে, চিঠিটি ভিজিয়ে দিচ্ছে।

তোকে আমি অনেক ভালবাসি। তোকে ছাড়া আমার জীবনে অন্য কাউকে কখনোই আমি ভাবতে পারিনা, আর কখনো পারবো না। আমার পরিবার কোনভাবেই তোকে মেনে নেবে না। কারণ, আমার বাবা-মা একজন ম্যাজিস্ট্রেটের সাথে আমার বিয়ে ঠিক করেছে। তারা চায় আমি তাকেই বিয়ে করি। আজ রাতে আমার বিয়ে। কিন্তু কিভাবে আমি তোকে ছাড়া, অন্য কাউকে বিয়ে করি বল?

জানি তুই চাইলেও, পালিয়ে যেতে পারবিনা। কিন্তু আমিও অন্য কাউকে স্বামী হিসেবে মেনে নিতে পারবো না। তাই এই জীবন থেকে পালিয়ে গেলাম। আমাদের এই সমাজ অনেক নিষ্ঠুর। নিষ্ঠুর এই পৃথিবীটা। তাই তোর সাথে, এই জনমে আর মিলন হবে না। আমাদের জন্য এই পৃথিবীটা নয়। চলে যাচ্ছি আমি অন্য পৃথিবীতে। থাকবো আমি তোর প্রতীক্ষায়।

(শ্রাবনীর চিঠির প্রতিটি কথা আমার হৃদয় ক্ষতবিক্ষত করছিল। আমিও এই নিষ্ঠুর পৃথিবী হতে বিদায় নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু, থমকে গেছি আমি আমার মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে।)

বন্ধুরা, ভালোবাসা অনেক কাঁদায়। জীবনটা এলোমেলো করে। তবুও, এই ভালোবাসাই জীবনকে পূর্ণ করে। এই পৃথিবীর সৃষ্টি থেকেই ভালোবাসা ছিল, ভালোবাসা আছে ও ভালোবাসা থাকবে। আজকে কবিতার সেই দুটি লাইন আমার বড্ড মনে পড়ে,

মিলনে প্রেমের ক্ষয়,

বিরহে প্রেমের জয়।

আমাদের প্রেম বেঁচে থাকবে আজীবন। বাঁচিয়ে রাখবো আমি। যতদিন আমাদের  জীবনের এই গল্পটি পৃথিবীর মানুষ পড়বে, ততদিন বেঁচে থাকবে আমাদের ভালোবাসা।


এ জাতীয় আরো ..