খিদা

WriterBD / ১২৪ বার পঠিত
আপডেট : রবিবার, ১০ জানুয়ারি, ২০২১
Picture- Google

  • ইছাগঞ্জের দত্তপাড়ার এবারের থিম পূজার বাজেট অন্যান্য বারের প্রায় চার ডাবল। আকাশ ছোঁয়া মন্ডপের মাথায় রঙিন চাঁদোয়া টাঙানো। সেখান থেকে বরফ কুচির মতো নীচের দিকে সাদা সাদা কীসব নেমে এসেছে। এন্ট্রি গেট থেকে ঢুকে গিয়ে দুপাশের দেওয়ালে কাঠ আর বাঁশ কেটে বানানো নিখুত ডিজাইন। মন্ডপের ভেতরে আবার আবার কাঁচের চোখে তাক লাগানোর মতো কাজ। এতো ডিজাইনের মধ্যে, প্রতিমাটাই কেমন একটা কোণঠাসা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এবার এই পাড়ার ক্লাবের নাকি সুবর্ণ জয়ন্তী বর্ষ। আর সেজন্যই এতো জাকজমক।
  • তৃতীয়াতেই মণ্ডপ খুলে দেওয়া হবে দর্শনার্থীর জন্য। তার আগে মন্ডপের ফিতা কাটবেন গোপাল কৈবর্ত। গোপাল বাবু, শুধু ইছাগঞ্জের এমএলএ নন, বরং উনি রুলিং পার্টির একজন মুখও বটে। পার্টির একটা ভালো পজিশনে আছেন। মন্ডপের একপাশে স্টেজ মতো বানানো হয়েছে। নীচে সারি সারি চেয়ার। সামনের সারিতে গদি সোফা, পেছনের দিকে প্ল্যাস্টিকের লাইন করে রাখা চেয়ার। একদম পেছনের চেয়ারগুলোতে কারো পায়া ভাঙা, কোনোটার বসার জায়গা ডিফেক্টিভ। সঙ্গতভাবে সামনের সারির সোফায় বসবেন আমন্ত্রিত অতিথি ছাড়াও, এলাকার গণ্যমান্যরা। পেছনের সারিতে আমজনতা। আর সোফা আর চেয়ার মাঝে বাঁশের ব্যারিকেড করা। কারন জলে তেলে মিশে গেলে আঁখেরে ক্লাবের চাপ। কথা ছিলো গোপাল কৈবর্ত মন্ডপের ফিতা কেটে, স্টেজে উঠে নিজের কিছু বক্তব্য রাখবেন; ওনাকে ক্লাব থেকে সম্মানিত করা হবে পুষ্পস্তবক আর শাল জড়িয়ে। তারপর গোপাল বাবু এসে বসবেন ব্যারিকেডের এপাশের সোফায়। সোফার গায়ে কাগজ ঠাসা আছে; ওতে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা “ভিআইপি”।
  • ব্যারিকেডের ওপারের চেয়ারগুলো ভর্তি হতে শুরু করেছে। এপারের সোফায় গোপাল বাবুর সিটটা ছাড়া বাকি সিটগুলো প্রায় ভরে গেছে। ঘড়িতে প্রায় সাতটা ছুঁই ছুঁই। অথচ এখনো অনুষ্ঠান শুরু করা যাচ্ছে না। কারন এমএলএ গোপাল কৈবর্ত এখনো এসে পৌছাননি। দর্শক আসনে সবাই অপেক্ষা করছে; সঞ্চালক বারকতক স্টেজে উঠে বলে গেলেন মাইকে-“আর কিছুক্ষণের অপেক্ষা। আমাদের সম্মানীয় অতিথি আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের মধ্যে এসে উপস্থিত হবেন। তারপরই আমরা ফিতে কাটার মধ্য দিয়ে আমাদের অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা করবো।“
  • দর্শক আসনে কেউ ঘড়ি দেখছে ঘন ঘন; কারো কারো মুখে আবার বিরক্তি। ঘড়িতে যখন সাড়ে সাতটা প্রায় বাজে বাজে করছে, তখন হঠাৎ বাইরে একটা সোরগোল মতো শোনা গেলো। মিডিয়ার ক্যামেরাম্যান যারা এককোণে বসে মারছিলো এতোক্ষণ, তারাও দেখি মাইক ক্যামেরা নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে হন্তদন্ত হয়ে বাইরের দিকে বেড়িয়ে গেলো। দর্শক আসনে থেকে কয়েকজন মুখ উঁচু করে দেখার চেষ্টা করলো ব্যাপারটা। কিন্তু কেউ কিছু আঁচ করতে পারলো না। তারপর একটা চাপাস গুঞ্জন শোনা গেলো ভিড়ের মধ্য থেকে- “গোপাল বাবু চলে এসেছেন…”
  • ছিপছিপে চেহারার ভদ্রলোক; চাপা গায়ের রঙ; মাথার চুল একপাশে পাটপাট করে আঁচড়ানো; ঠোঁটের ওপরে গোঁফের সরু রেখা; দাড়ি কামানো। পড়নে চেক শার্ট আর ফরমাল প্যান্ট। গোপাল কৈবর্ত ফিতে কাটলেন। চারপাশে মানুষের হাততালি; ক্যামেরার ফ্ল্যাস লাইটের ঝলসানি; ভিড়ের৫ মধ্যে থেকে মানুষজন, রিপোর্টাররা গোপাল বাবুর সমস্তটা ক্যামেরাবন্দী করছে। ফিতে কাটার পর গোপাল বাবুকে ক্লাবের আয়োজকরা আদর আপ্যায়ন করে স্টেজে ওঠালো। সেখানে ওনাকে ফুলের তোড়া, উত্তরীয় পরিয়ে সম্মানিত করা হলো। মাইকে নিজের বক্তব্য রাখার পর, গোপাল কৈবর্তকে এনে বসানো হলো, “ভিআইপি” ট্যাগ লাগানো গদি সোফায়। অনুষ্ঠানের পর খাওয়া দাওয়ার আয়োজন। লম্বা টেবিল আর চেয়ার পাতা হয়েছে ক্লাব ঘরে। গোপাল বাবু বসেছেন টেবিলের ঠিক মাঝখানে। ওনার দুপাশে বাদবাকি আমন্ত্রিতরা। ক্লাবের লোকজন গোপাল বাবুকে খাতির যত্ন করলো বটে; যেমন মাছের গাদার পিসটা ওনার পাতে তুলে দিলেন; পাঠার মাংসের ক্ষেত্রে ওনাকে জোরাজুরি করে আরো চার পিস পাতে দিলেন। বাদবাকিদের জন্য একটা নলেন গুড়ের রসগোল্লা বরাদ্দ হলেও, গোপাল বাবুকে ওরা দুটো রসগোল্লা পাতে তুলে দিলো। গোপাল বাবু মুখে কিছু বললেন না বটে; কিন্তু সেভাবে কিছুই খেলেন না। দুটো ভাত নিয়ে নাড়াচাড়া করে, দুটো মুখে দিয়ে উঠে গেলেন। বেরোনোর সময় আয়োজক কমিটির একজন গপাল কৈবর্তকে জিজ্ঞেস করলেন-“এখনই ফিরে যাচ্ছেন?”
  • হেসে উত্তর দেন গপাল বাবু- “হ্যাঁ ওই আরকি… উঠি আজকে।
  • “আয়োজক কমিটির লোকটা এবার একটু কাচুমাচু মুখেই বললেন-“কিছুই তো খেলেন না স্যার। রান্না ভালো লাগেনি?” গোপাল বাবু হেসে উত্তর দিলেন- “না না রান্নাটা সমস্যার না। সমস্যাটা অন্যখানে…”
  • -“কী স্যার?”
  • -“আসলে পুরোন কিছু কথা মনে পরে গেলো আরকি…”
  • -“কী কথা স্যার? আমাদের কোনো ভুলত্রুটি হয়ে থাকলে নিজগুণে ক্ষমা করে দিয়েন স্যার…”
  • -“না না তেমন কিছু না…” –কথাটা বলে একটু থামলেন গোপাল বাবু। কী একটা ভাবলেন কিছুক্ষণ ধরে। তারপর শান্ত গলায় বললেন-“অনেকদিন আগের কথা বুঝলেন। আপনাদের পাড়ার ঠিক পেছনে যে চাবাগানটা দেখছেন, এখানে আমার বাবা মালির কাজ করতো। আর এই দত্তপাড়ার এক অংশটা জুড়ে ছিলো কোয়াটার। কাঠের ঘর, টিনের চাল- সাদামাটা কোয়াটারগুলো। যাদের স্বচ্ছলতা একটু বেশী, ওরা নিজেরা একটু কোয়াটারগুলো সাজিয়ে গুছিয়ে নিতো। ছোটোবেলার কথা তো বোঝেন। তখন আমাদের কেউ শেখায় না মালির ছেলে, বাবুর ছেলের ফারাকগুলো। নীচু জাত, ব্রাহ্মণ এসব কিছুও বুঝতাম না বিশেষ। পদবী দেখেই বুঝছেন, আমরা সেরকম উঁচু জাতের নই। তারওপর মালির ছেলে। আমাদের খেলার সঙ্গীসাথী ছিলো সাগ্নিক, মনীষ, আলোক… বাবুদের ছেলেপেলের সাথেই আমাদের একসাথে খেলাধুলা, ওঠাবসা। সেবার পূজার সময় একসাথে ভোগের প্রসাদ খেতে বসেছিলাম। মাটির ওপর চাদর পেতে খাওয়ার আয়োজন করা হয়েছিলো। আসনের সামনে কলাপাতা পাতা। ওখানেই ভোগ দেওয়া হচ্ছে। আমি ওই সাগ্নিক, মনীষদের সাথেই একসাথে খেতে বসেছিলাম। সাগ্নিকের বাবা, মনীষের বাবা এরা সবাই চা বাগানের বড়ো বড়ো পোস্টে কাজ করতো, তার ওপর বামুন। এদের মাঝখানে আমি কৈবর্ত… মালির ছেলে। পাতে ভোগ বেরে দিয়েছে। আমি খেতে যাবো, হঠাৎ বাগানের একজন ড্রাইভার ছিলো বরুণ ভট্টাচার্য, সে এগিয়ে এসে আমার উদ্দেশ্যে বিশ্রী ভাষায় বলল-
  • “অ্যাই, তুই এখানে খেতে বসেছিস কেন?” আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকালাম ওনার দিকে। কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। লোকটা আবার বলল_”একে নীচু জাত, তারওপর মালির ছেলে! এখানে এদের সাথে খেতে বসেছিস, কান্ডজ্ঞান নেই হারামজাদা? ওঠ বলছি!” আমার ডানহাতে তখনও ভগের গ্রাস তলা। মুখে দেইনি। হাত ধরে হ্যাঁচকা টান মেরে আমাকে খাওয়ার পাত থেকে উঠিয়ে নিয়ে গেছিলো বরুণ ভট্টাচার্য। আজ এতোবছর পর দেখুন সেই আমিই নাকি আপনাদের পূজার চিফ গেস্ট। ব্যাপারটা ঠিক কেমন একটা লাগছিলো। খাওয়ার পাতে মুখে গ্রাস তুলতে গিয়ে বারবার সেদিনের খাওয়ার পাত থেকে আমাকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথাটা মনে পড়ছিলো। খাবারটা তাই গলা দিয়ে নামছিলো না।“
লেখাঃ- Mriganka Chakraborty

This is a very helpful website. We can find our needy post or tips from this site . I think it is essential for us.


এ জাতীয় আরো ..