এটা কোনো গল্প না

WriterBD / ৮২ বার পঠিত
আপডেট : রবিবার, ১০ জানুয়ারি, ২০২১
Picture- WriterBD

মৃগাষ্ক চক্রবর্তী
একটা ভীষণ খারাপ অভিজ্ঞতা শেয়ার করছি। আমি জানি না কতজন মানুষ এই সমস্যায় আগেও পড়েছেন।
আমার দাদুর বয়স ৮৭ বছর। আলিপুরদুয়ারে থাকেন। বছরখানেক আগে পেসমেকার বসেছে। এমনিতে হাঁটাচলা করলেও, বয়সের কারনেই নানারকম সমস্যায় ভুগছেন। তারমধ্যে এখন কানেও কিছুটা কম শোনেন। এখন হাঁটতে হলেও লাঠি নিয়ে হাঁটেন সাপোর্ট হিসেবে।
দাদুভাই রেলে কাজ করতেন। রেলের স্টাফ হওয়ার কারনে রেল হাসপাতালেই উনি নিজের রুটিন চেক আপ করান। দাদুভাই আজকে আমাকে নিয়ে আলিপুরদুয়ার রেল হাসপাতালে “রিপিট” করাতে গেছিলেন। “রিপিট” মানে, দাদুভাইয়ের মতো রেলের স্টাফদের একটা খাতা করা থাকে; সেখানে ওষুধপত্র, চেকআপ, টেস্ট, মেডিক্যাল হিস্ট্রির সমস্ত কিছু ডেট ওয়াইজ লেখা থাকে; ডেট ওয়াইজ হিট্রির নীচে থাকে ডাক্তারের সিগনেচার। রেল হাসপাতালের ওষুধ কাউন্টার থেকে ওষুধ নিতে গেলে, আগে আউটডোরের কোনো একজন ডাক্তারকে দিয়ে খাতায় লিখিয়ে, সই করিয়ে নিয়ে কাউন্টারে সেই খাতা দেখিয়ে ওষুধ তুলতে হয়।
দাদুভাইও ওষুধ নেওয়ার ব্যাপারে “রিপিট” করতে রেল হাসপাতালের আউটডোরের একটা ডাক্তারের চেম্বারে ঢোকেন। ডাক্তার ভদ্রলোকটি আমাদের দেখে, দাদুভাইকে ঘরের কোণায় একটা টুলে বসতে বললেন। আমি পাশে দাঁড়িয়ে। আমি দাদুভাইয়ের কাছ থেকে খাতাটা নিয়ে ডাক্তারবাবুর দিকে এগিয়ে দিলাম। যেহেতু দাদুভাই কানে একটু কম শোনেন, তাই ডাক্তারবাবুর কথা ঠিক মতো দাদুভাই বুঝতে পারছিলেন না।
সেক্ষেত্রে আমি ডাক্তারবাবুর কথা দাদুভাইকে বলে বলে বুঝিয়ে দিচ্ছিলাম। ডাক্তারবাবুর কিছু কথা দাদুভাই নিজেই বুঝতে পারছিলেন। প্রথমত ডাক্তারবাবুর ব্যাবহার ভীষণ রুড ছিলো। উনি দাদুভাইকে দেখে ইমিডিয়েটলি ভর্তি হতে বললেন হাসপাতালে। দাদুভাই ওষুধ তোলার ব্যাপারে রিপিট করতে এসেছিলেন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ব্যাপারে প্রস্তুত ছিলেন না। দাদুভাই ডাক্তারবাবুকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন এই মুহূর্তে ভর্তি হওয়া পসিবেল না; আমিও ডাক্তারবাবুকে বললাম, এই মুহূর্তে ভর্তি না করিয়ে, আমরা বাড়িতে গিয়ে একটু কথা বলে তারপর ডিসিশন নিচ্ছি।
দাদুভাই নিজে ৮৭ বছরের একজন। হঠাৎ ভর্তি হওয়ার কথা শুনে উনি নিজেও একটু ঘাবড়ে গেছিলেন। উনি নিজেও জাস্ট ওষুধ তুলতে এসেছিলেন; ভর্তি হোওয়ার কোনোরকম প্রিপারেশন নিয়ে আসেননি। নিজেও চাইছিলেন না ভর্তি হতে। উনি সেটা ডাক্তারবাবুকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। ওই মুহূর্তে ডাক্তারবাবু দাদুভাইকে যে কথাটা বলেন সেটা আমি কোট করছি এখানে “বেশী কথা বলবেন না দাদু” ।
উনি এই কথাটা বারকতক রিপিট করেন। একজন ৮৭ বছরের রুগীর সাথে নমনীয় ব্যাবহার করার বদলে উনি রুডলি বলতে থাকেন দাদুভাইকে “না হলে বুঝবেন, আমি কিছু বলবো না…”। দাদুভাই ওনাকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন, উনি হিমোগ্লোবিন টেস্ট দুই তিনদিন আগেই করিয়েছেন, কেএফটি টেস্ট উনি কাল পরশু করিয়ে নেবেন। ডাক্তারবাবু সেসব কিছুই প্রপারলি শুনছিলেন না। ওনার মুখে একটা কথাই বারবার ঘুরেফিরে আসছিলো-“বেশী কথা বলবেন না দাদু…”।
তারপরের ঘটনা খুব ছোটো। ওই ডাক্তারবাবুর চেম্বার থেকে বেড়িয়ে আসছি দাদুভাইকে নিয়ে। ডাক্তারবাবুর ব্যাবহারে দাদুভাই নিজেও একটু ঘাবড়ে গেছেন। দেখি পাশের ঘরে ঢুকছে আমারই একজন স্কুলের বন্ধু। সে এখন রেল হাসপাতালের ডাক্তার। ওদের রুমে ঢুকলাম।
ঐখানে আমার আরেকজন বন্ধুও ছিলো। সেও রেলের আউটোডোরের ডাক্তার। ওদের সাথে কথা বললাম। দাদুভাইকে ভেতরে নিয়ে গিয়ে ওরা বসতে দিলো। আমাকেও বসতে বলল। দাদুভাইয়ের থেকে মনোযোগ দিয়ে ওরা সব শুনলো। কী কী করতে হবে সেসব দাদুভাইকে ওরা খুব গুছিয়ে ভালো করে বুঝিয়ে দিলো। ওদের ওখান থেকে বেড়িয়ে দাদুভাই ওষুধ কাউন্টারে গেলো। আমি কিছুক্ষণ পুরোনো বন্ধু দুজনের সাথে একটু গল্প করে বেড়িয়ে এলাম।
এবার আমার প্রশ্নটা খুব সহজ। প্রথম যে ডাক্তারের চেম্বারে আমি দাদুভাইকে নিয়ে ঢুকেছিলাম; সেই ভদ্রলোক যেরকম ব্যাবহার একজন ৮৭ বছর বয়সের বৃদ্ধ রোগীর সাথে করলেন আর ওনার মুখের সেই বারকতক উচ্চারণ করা “বেশী কথা বলবেন না দাদু…” – এই ব্যাবহারটা একজন ডাক্তার হিসেবে, শুধু ৮৭ বছরের একজন বৃদ্ধ রোগী নয়, অন্য যেকোনো রোগীর সাথে উনি কি করতে পারেন?
অসুখ শুধু শরীরের নয়। মনেরও। সেক্ষেত্রে ডাক্তারের কি উচিৎ নয়, রুডলি ব্যাবহার না করে, রোগীর কথা ভালো করে শোনা আর রোগীকে ভালো করে নিজের পয়েন্টগুলো বোঝানো? কারপন ডাক্তারের ভালো ব্যাবহার রোগীর মনে অনেকখানি ভরসা দেয়। আর মানুষের বয়স হলে সে অনেক শারীরিক সমস্যায় জর্জরিত হয়। সেক্ষেত্রে ওনার সত্যিই কি বলার রাইট আছে একজন ৮৭ বছরের রোগীকে “বেশী কথা বলবেন না দাদু”
প্রশ্নটা আপনাদের করলাম। উত্তর আপনারা বলবেন আমাকে।


এ জাতীয় আরো ..