ভাদাভাদি

WriterBD / ৬৫ বার পঠিত
আপডেট : রবিবার, ১০ জানুয়ারি, ২০২১
Picture- Google

WMriganka Chakrabor
(ভাদাভাদি উত্তরবঙ্গের রাজবংশী সমাজের দুজন মেয়ের মধ্যে সই বা বন্ধুত্ব পাতানোর রীতি। ভাদাভাদি ছাড়াও, মিতর পাতানো, সখার হাল, পানিছিটা এগুলোও আত্মীয়তা পাতানোর নানারকম উৎসব রীতি রিয়াজ…)
-“অ্যাই, ভালো করে বালতি দুয়েক জল ঢেলে, ঝাড়ু চালিয়ে রাখবি। অধিকারী মশাই এলেন বলে৷ হাত চালা, জলদি হাত চালা…”
– প্রহ্লাদকে নির্দেশ দেন ধনঞ্জয় বাবু৷
ব্যস্ততার মধ্যে সমস্তটা একা হাতে সামলাতে হচ্ছে ওনার। অধিকারী মশাইয়ের সাথে পূজার ব্যাপারে কথা বলা থেকে বাজারহাট পুরোটাই দেখছেন ধনঞ্জয় বাবু। আর প্রহ্লাদটাও হয়েছে ঠিক তেমনি শান্ত স্বভাবের ছেলে। মা মরা ছেলে, সেই ছোটো থেকে ধনঞ্জয় বাবুর বাসায় মানুষ।
বাবুর কথা মতো তুলসীতলার সামনের জায়গাটা ভালো করে পরিষ্কার করে রেখেছে সে।
বেলা বারোটা নাগাদ বাসায় ঢোকেন অধিকারী মশাই। চারপাশটা একবার ভালো করে দেখে শুনে নিয়ে, বেশ খুশী হন ধনঞ্জয় বাবুর ব্যাবস্থাপনায়। হাত মুখ ধুয়ে নিয়ে, তুলসীতলায় পূজায় বসে যান তিনি। তুলসীতলায় পূজার সরঞ্জাম সাজানো আছে আর তার সামনে পেতে রাখা হয়েছে বসবার দুটো আসন। আসন দুটোয় কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে বসবে ধনঞ্জয় বাবুর মেয়ে স্বপ্না আর রমাকান্ত বাবুর মেয়ে কুসুম।
ধনঞ্জয় বাবুর বাসায় আজ “ভাদাভাদি” উৎসব। সাধারণ মানুষজনের কাছে “ভাদাভাদি” নামটা নতুন হলেও, উত্তরবঙ্গের এদিকে গ্রামাঞ্চলের দিকের মানুষেরা এই নামটার সাথে ভীষণভাবে পরিচিত। এই অঞ্চলের রাজবংশী সমাজে ভাদাভাদি হলো, দুজন মেয়ের মধ্যে বন্ধু পাতানো বা সই পাতানোর মধ্যে দিয়ে আত্মীয়তার সম্পর্ক তৈরির উৎসব।
কুসুমদের বাড়ি স্বপ্নাদের পাশের গ্রামেই। ওরা একই স্কুলে পড়ে; সেই সূত্রে ওদের মধ্যে বন্ধুত্ব। ধনঞ্জয় বাবু আর রমাকান্ত বাবুদের দুই পরিবারের মধ্যে অনেকদিন থেকেই আলোচনা চলছিলো। ধনঞ্জয় বাবু প্রস্তাব দিলেন ওনার বাসাতেই আয়োজন করা হোক। কথা মতো, চৈত্র মাসে একটা ভালো দিন দেখে, ভাদাভাদির নিয়ম মতো, নিজের বাসার পূবদিকের ঘরে থানছিরি দেবীর বেদীর সামনে মাটি কেটে বারো শস্যবীজ বুনলেন তিনি।
আর তার মাসখানেকের মধ্যেই অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের দিন বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ রমাকান্ত বাবু স্বপরিবারে সাথে করে কাপড় জামা, দই, মিষ্টি, চিনি নিয়ে হাজির হলেন ধনঞ্জয় বাবুর বাসায়। ধনঞ্জয় বাবু আতিথেয়তা করে ওনাদের নিয়ে গিয়ে বসালেন ভেতর ঘরে৷ বাইরে, দাওয়ায় তখন চলছে পূজার প্রস্তুতি। বাইরে এলাকার ছেলেরা করতাল, ঢোল, নানান বাজনা বাজাচ্ছে নিজস্ব তালে তালে। কিছুক্ষণের মধ্যে স্বপ্না আর কুসুম স্নান সেরে, নতুন কাপড় পড়ে, এসে বসলো, পুরোহিতের সামনে রাখা আসন দুটোয়। সকাল থেকেই কুসুমের শরীরটা ঠিক লাগছে না। অসুস্থ শরীর নিয়ে সারাটা দিন উপোষ, আর তারসাথে পূজার নিয়মকানুন- শরীর যেন টানছেনা কুসুমের। কালও তো দিব্যি ছিলো শরীর; হঠাৎ করে রাতারাতি কী যে হলো মেয়েটার; যেন কেমন ঝিমিয়ে পড়েছে, তবুও গায়ের জোরে চলাফেরা করছে। এতো খরচাপাতি করে পূজার আয়োজন করা হয়েছে, লোকজন নিমন্ত্রণ করা হয়েছে, এরমধ্যে অনুষ্ঠান বাতিল করা চলেনা। তবুও ধনঞ্জয় বাবু ভালো মানুষ; কুসুমের অসুস্থতা দেখে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিলেন একবার-“তবে কি আজ অনুষ্ঠানটা… না হয় অন্যকোনো দিন না হয় করা যাবে…”
রমাকান্ত বাবুর মন তাতে সায় দেয়না-“না না ওসব হয়তো গ্যাস অ্যাসিডের কারনে হয়েছে; তারওপর এখন এই শীত, এই গরম, ঘরে ঘরে জ্বরজারি হচ্ছে; ওসবই কিছু হয়তো; ও ঠিক হয়ে যাবে।”
স্বপ্না আর কুসুম এসে বসলে, পুরোহিত মন্ত্র পড়তে শুরু করেন। এরপর একটা তীর-ধনুক তুলে কুসুমের হাতে দিয়ে বললেন-“মা, আমি যে মন্ত্রটা এখন বলবো, আমার সাথে সাথে সেটা উচ্চারণ করে, স্বপ্নার হাতে তীর-ধনুকটা দিয়ে দেবে। কেমন মা?”
মেয়েটা কেমন ঝিম ধরে আছে। চোখ মুখ বসে গেছে। শরীর দুর্বল লাগছে। তারমধ্যেই ঘাড় নাড়িয়ে সম্মতি জানায় কুসুম।
-“স্বআমির মনত যদি খটা দি, তে এই তীর দিয়া তোর হাতত হানিম।”
পুরোহিতের সাথে সাথে জোরে জোরে উচ্চারণ করে কুসুম হাতের তীর-ধনুকটা স্বপ্নার হাতে তুলে দেয়। তীর-ধনুকটা হাতে নিয়ে স্বপ্নাও একই কথা কুসুমের দিকে তাকিয়ে পুরোহিতের সাথে সাথে উচ্চারণ করে বলে। পূজার প্রথম ধাপ শেষ। চারপাশে এলাকার লোকজন ঘিরে রয়েছে ওদের। ধনঞ্জয় বাবুর দাওয়ায় আজকে উৎসবের আমেজ। ছেলেরা বাজনার বাজিয়ে চলেছে একনাগাড়ে।
এরপর বাজনাওয়ালাদের সাথে নিয়ে, ধনঞ্জয় বাবু, রমাকান্ত বাবু, অধিকারী মশাই, আর দুই পরিবারের কয়েকজন মিলে স্বপ্না আর কুসুমকে নিয়ে যায়, লালদিঘির পাড়ে। সেখানে স্বপ্না আর কুসুম তিনবার ডুব দিয়ে দুজন দুজনের সাথে সই পাতবে। রাস্তায় যেতে যেতে কুসুমের কয়েকবার পায়ের ব্যালেন্স ঠিক রাখতে না পেরে পা হড়কে যাচ্ছিলো; আবার নিজেকে সামলে নিয়ে এগিয়ে চলছিলো; বাজনার আওয়াজ, আর উৎসবের আনন্দে ব্যাপারটা সবার চোখের আড়াল হয়ে থেকে গেলো। দিঘির পাড়ে এসে অধিকারী পুরোহিত ওদের দুজনের হাতে পান আর গুয়া সুপারী ধরিয়ে দিয়ে, বুঝিয়ে বলেন-“দেখো মা তোমরা একসাথে দুজন পান সুপারী হাতে নিয়ে এই পুকুরে তিনবার ডুব দিয়ে উঠে আসবে, তারপর ঘাটে এসে “ধর্মঠাকুর আর এই ঠেগার সগাকে সাক্ষী মানিয়া হামেরা সই পাতাছি; হামার এই দুই ঝনকার মিল কুন দিন ভাঙ্গিবার না হয়; সইত্য, সইত্য, তিন সইত্য”- এই মন্ত্রটা উচ্চারণ করে দু’জন দু’জনকে হাতের পান সুপারীটা খাইয়ে দিয়ে বাসায় ফিরে উপাস ভাঙবে। বুঝলে?”
অধিকারী পুরোহিতের কথায় সায় দেয় দুজন। ঘাট পাড়ে আকাশ ছোঁয়া আওয়াজে ছেলেরা বাজনা বাজিয়ে চলেছে। ভিড় করেছে দুই পরিবারের সদস্য, এলাকার কিছু লোকজন। স্বপ্না আর কুসুম লালদিঘির জলে ডুব দিতে ঘাটপাড়ের পিছল সিড়ি দিয়ে আস্তে আস্তে দুজন দুজনকে ধরে ধরে নেমে গেলো।
একডুব… দু’জন একসাথে ওপরে উঠে মিটিমিটি হাসতে হাসতে আবার দ্বিতীয় ডুব দেয় দিঘিতে; দুইডুব… আবার দুইজন একসাথে উঠে আসে ওপরে; কুসুমের চোখের দিকে তাকিয়ে স্বপ্নার কেমন একটা সন্দেহ হয় মনে; কুসুমকে কেমন যেন ঠিক লাগছে না। একবার ভাবে ওকে জিজ্ঞেস করবে; তারপর আবার কী একটা ভেবে তখনকার মতো ব্যাপারটা চেপে যায় সে। তৃতীয়বার ডুব দেওয়ার জন্য দুইজন আবার নীচু হয়; তিনডুব… স্বপ্না ওপরে উঠে এসে দেখে কুসুম নেই। কোথায় গেলো কুসুম? এই তো একসাথে দু’জন ডুব দিলো। তবে কি কোনোভাবে পা হড়কে ডুবে গেলো ও? এক মুহুর্তের জন্য ভীষণ ভয় পেয়ে যায় স্বপ্না। কুসুমের নাম ধরে চিৎকার দিয়ে ডাকাডাকি শুরু করে সে।
কিন্তু কোনো উত্তর নেই। কুসুম পাকা সাতারু মেয়ে। ডুবে যাওয়া সম্ভব নয় কোনোভাবে। স্বপ্নার চিৎকারে আশেপাশের আত্মীয়, পরশীরা ঘাটপাড়ে নেমে এসেছে। তাদের চোখে মুখে ভয়। রমাকান্ত বাবু আতঙ্কে ছটফট করতে থাকেন; পারলে তখনই কুসুমকে খুঁজতে নিজে দিঘিতে ডুব দেন; পাড়ার ছেলেরা ওনাকে শান্ত করে দূরে নিয়ে যায়। ধনঞ্জয় বাবুর মুখে কথা নেই। ব্যাপারটা ঠিকমতো আঁচ করতে পারছে না কেউই। পাড়ার কমবয়সী কয়েকজন ইতিমধ্যে দিঘিতে নেমেছে কুসুমকে খোঁজার জন্য। হঠাৎ শান্ত দিঘির জল কেঁপে উঠলো। ভেসে উঠলো দিঘির জলে শ্যাওলা, আগাছা জড়ানো কুসুমের বডিটা। তবে সেই শরীরে প্রাণ নেই।
ব্যাপারটা জানতে পেরে চিৎকার দিয়ে কেঁদে ওঠেন রমাকান্ত বাবু-“আমার জন্যই আজকে…মেয়েটা সকাল থেকে কেমন করছিলো… কেন যে ওকে… সব আমার জন্য!”
ধনঞ্জয় বাবু আর দুই পরিবারের সবাই শোকে মুহ্যমান। বলার মতো ভাষা সবার মুখ থেকে উধাও হয়ে গেছে। ঘাটপাড়ের সমস্ত বাজনা মুহুর্তে থেমে গিয়ে এখন জায়গাটাকে যেন শ্মশানের মতো শূন্যতা গিলে খাচ্ছে।
পাড়ার ছেলেরা ধরাধরি করে কুসুমের বডিটা পাড়ে তুলে নিয়ে এলো। স্বপ্নাও শোকে কাঠ হয়ে আছে। সমস্ত শরীর শক্ত, হাত পায়ের তালু ঠান্ডা হয়ে গেছে আতঙ্কে। মৃত্যু বরাবর আমাদের স্তব্ধ হতে শেখায়। কিছুক্ষণ আগেই তো হেঁটেচলে বেড়াচ্ছিলো মানুষটা, আর এখন- লাশ।
ব্যাপারটা মেনে নেওয়া খুব সহজ নয়। কিন্তু একটা কথা কিছুতেই কেউ মেলাতে পারছে না। যে মেয়েটা সাতার জানে, ডোবার মুহুর্তে সে একটু হলেও হাত পা ছুড়ে নিজেকে বাঁচাতে চাইবে; সাধারণত সাতার জানা মানুষগুলো এভাবে সহজে ডুবে মরে শোনা যায় না। তবে… কোনো হিসেবই যেন মিলছে না কোনোভাবে। এই ঘটনার পর বেশ কয়েকটা বছর কেটে গেছে।
স্বপ্না এখন বয়সের দিক থেকে পরিণত। তার সম্বন্ধ করে বিয়ে ঠিক করা হয়েছে কদমতলা গ্রামের দ্বারকানাথ রায়ের একমাত্র ছেলে অলোক রায়ের সাথে। পাত্র পেশায় সরকারি দপ্তরের কেরানী।
যদিও এই বিয়েতে রাজী ছিলো না স্বপ্না। রাজী না হওয়ার কারনটাও বেশ সঙ্গত। এই পাড়াতেই তো কুসুমের বাড়ি ছিলো। ছোটোবেলায় কতো এসেছে সে এই পাড়ায়। কুসুমের হঠাৎ করে চলে যাওয়াটা স্বপ্না আজও মেনে নিতে পারেনি। সেই দিনের ঘটনায় আজও আতকে ওঠে সে। কুসুমের পাড়ায় বিয়ে হয়ে যাওয়াটা ওর কাছে ভীষণ অস্বস্তির একটা ব্যাপার। এই পাড়াগাঁয়ের সাথে যেন আজও কুসুমের গন্ধ লেগে আছে; আজও এই এলাকার আনাচে কানাচেতে কান পাতলে যেন শোনা যাবে কুসুমের হাসি, ধানক্ষেতের আঁকাবাঁকা আলপথ দিয়ে ওর দৌড়ে চলা, ওর শাড়ির আচলের চেনা গন্ধ। ওসব কিছু যেন স্বপ্নাকে আরও বেশী করে মনে করাবে কুসুমের না থাকাটা। তাই সম্বন্ধটা আসতেই না করে দেয় স্বপ্না। কিন্তু ছেলে সরকারি অফিসে পাকাপোক্ত চাকরি করে আর পরিবারটাও ভালো, সব দেখেশুনে, ধনঞ্জয় বাবুও চাপ দেন স্বপ্নাকে বিয়েতে রাজী হতে। অবশেষে বাড়ির চাপেই একপ্রকার রাজী হয় স্বপ্না।
নির্বিঘ্নেই বিয়ের সব কাজকর্ম মিটে যায়। বিয়ে হয়ে স্বপ্না আসে কদমতলার রায়বাড়িতে।
গরমকালের রাত। ফুলশয্যার রাতে, শ্বশুরবাড়ির একটা ঘরে চুপচাপ বসে আছে স্বপ্না। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার স্বামী অলোক ঘরে এসে ঢুকবে। অলোক ছেলেটা স্বভাবে বেশ লাজুক আর স্বল্পভাষী। আপন মনে জানালার শিক ধরে বাইরেরটা দেখছিলো স্বপ্না।
বাইরে তখন গভীর রাত। রাস্তাঘাটে ফাঁকা; কেউ কোথাও নেই। বাইরেটা অন্ধকার; রাতের মিশমিশে কালো বুক ছিড়ে জ্যোৎস্না রাতের রূপালী আলো এসে পড়েছে এই চেনা পৃথিবীর অস্থিমজ্জায়। গাছের শুকনো পাতাগুলো মৃদু হাওয়া এসে নাড়িয়ে দিয়ে যায়। জ্যোৎস্নার আলোআধারির মাঝে, গাছের পাতাগুলো যেন ছায়া এঁকে দেয় রূপোলী অন্ধকার দৃশ্যপটে। দেখতে দেখতে কল্পনায় হারিয়ে যায় স্বপ্না- আমরা মানুষগুলো একে অন্যের চেয়ে কতোটা আলাদা, তবু, আমাদের আকাশগুলো এক। যেন বছরের পর বছর এক ছাদের নীচে শীত গ্রীষ্ম বর্ষা কাটিয়ে দিচ্ছি সবাই একসাথে।
হঠাৎ হুশ ফেরে স্বপ্নার একটা চেনা গলার আওয়াজে- “পালিয়ে যা এক্ষুনি।”
ছায়ামতো কী একটা কখন যেন স্বপ্নার পেছোনে এসে দাঁড়িয়েছে নিঃশব্দে।
পেছনে তাকিয়ে চমকে ওঠে স্বপ্না। ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে কুসুম। সেই পুরোনো গোলগাল চেহারা, লালপেরে শাড়ি পড়া। এতোটুকু বদল হয়নি ওর এতোগুলো বছরেও। ওর ঘন খোলা চুলে যেন রাত নেমে এসেছে। পায়ে সেই সখীর মেলা থেকে কেনা নূপুর। কাজল টানা চোখদুটোতে যেন একটা রহস্য লুকোনো। ঠোঁটের কোণে একটা হাসির ছোঁয়া মাখা।
স্বপ্না ভীষণ ভয়ে পিছিয়ে দাঁড়িয়ে, কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে-“তু…তুই এখানে? তু…তুই তো…”
-“মারা গেছিলাম তাই তো?” – স্বপ্নার কথা শেষ না হতেই, হেসে উত্তর দেয় কুসুম।
-“হ্যাঁ… তাই তো… তুই তো সেই ভাদাভাদির সময়…ডুবে গেছিলি; ত…তবে তুই এখানে কী…কীভাবে এলি?”
– শুকনো কাঁপা স্বরে জিজ্ঞেস করে স্বপ্না।
-“সেটা তোর না জানলেও চলবে। তুই শিগগিরই পালা এখান থেকে। সময় নেই হাতে একদম। যা আছে সাথে, গুছিয়ে নে। আমি বেশীক্ষণ এদেরকে আটকে রাখতে পারবো না। আমার ক্ষমতা কম। এখনো কিছুটা সময় আছে। পালিয়ে যা…”
উদ্বেগের সুরে কুসুম তাড়া দেয় স্বপ্নাকে।
স্বপ্না অপ্রস্তুত হয়ে জিজ্ঞেস করে-“কিন্তু কেন? পালাবো কেন? কেন পালাতে বলছিস আমাকে? নতুন বিয়ে হয়ে এসেছি এখানে; কথা নেই, বার্তা নেই… কী বলছিস এসব? কেনই বা বলছিস?”
কুসুম বিরক্তির সুরে বলে-“কী কেন এসব তোর না জানলেও চলবে৷ আমি না তোর সই… ভুলে গেলি? সইকে বিশ্বাস নেই? এখন যা শিগগিরই। হাতে সময় খুব কম।”
কুসুম পথ দেখিয়ে বাড়ির বাইরে নিয়ে গেলো স্বপ্নাকে। সেই আলপথ, কাঁচাপাকা নির্জন রাস্তাঘাট, পোড়ো মন্দিরের পাড়, বক্সিদের আমবাগান, পাটখেত পেরিয়ে, রাতের অন্ধকারে কোনোমতে স্টেশনে পৌঁছে একটা প্যাসেঞ্জার ট্রেনে স্বপ্নাকে উঠিয়ে দেয় কুসুম।
ট্রেনের কামরায় লোকজন তেমন নেই। স্বপ্না কুসুমকে ডাকে-“তুই আসবি না? তুইও আয়…”
কুসুম হেসে উত্তর দেয়-“নারে। সাবধানে যাস তুই। নিজের খেয়াল রাখিস।”
নতুন বউ এভাবে শ্বশুরবাড়ি থেকে বিয়ের পরদিন পালিয়েছে, এটা খুব ভালো খবর না। শ্বশুরবাড়ি থেকে খোঁজাখুজি হয়তো হচ্ছে, কিন্তু সে খোঁজ স্বপ্না পায়নি। ট্রেনের ছুটে চলার সাথে সাথে নানান প্রশ্ন মাথায় ঘুরছিলো ওর। অবশেষে প্রায় শেষ রাতে ধুকতে ধুকতে বাসায় ফেরে স্বপ্না।
স্বপ্নাকে বিয়ের সাজে অতো রাতে বাসায় ফিরতে দেখে ধনঞ্জয় বাবুরা সবাই অবাক। স্বপ্নার গায়ে একশোর ওপর জ্বর, ঠিকভাবে কথা বলতে পারছে না, ভালোমতো তাকাতে পারছে না। বিড়বিড় করে ভাঙা ভাঙা স্বরে শুধু বলছে-“কুসুম এসেছিলো…কুসুম…”
বাড়ির কেউ কিছু জিজ্ঞেস করতে পারেনা ওকে। জিজ্ঞেস করার মতো শরীরের অবস্থাও নেই স্বপ্নার। বাড়ির সবাই কথা না বাড়িয়ে ধরাধরি করে ঘরে শুইয়ে দেয় স্বপ্নাকে। এতোরাতে ডাক্তার পাওয়া যাবে না। রাতটুকু জলপট্টী দিয়ে জ্বরটা নামিয়ে নিয়ে, কাল সকালে ডাক্তার ডাকা যাবে বরং।
পরদিন সকালে জ্বর সেরে গেলো স্বপ্নার। বাড়ির সবার মনেই অনেক প্রশ্ন ঘুরছিলো। তবে বেশীক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি উত্তর পেতে। স্বপ্নাসহ বাড়ির সবাই কারনটা জানতে পেরেছিলো পরদিন সকালের খবরের কাগজ খুলেই। কাগজে খবরটা প্রথম দেখে স্বপ্না; খবরটায় চোখ বুলিয়ে চমকে ওঠে সে-“বউভাতের দিন মাঝরাতে হঠাৎ ডাকাতের হামলা। নিহত কদমতলা গ্রামের অলোক রায় সহ তার গোটা পরিবার। অলোক রায় পেশায় সরকারি দপ্তরের কেরানি ছিলেন। খুনের পাশাপাশি আলমারি ভেঙে সমস্ত গয়নাগাটি নিয়ে পালায় ডাকাতদল।”
শ্বশুর বাড়ির সকলের মৃত্যুর খবরে বুক ফাটা কান্নায় ভেঙে পড়লো স্বপ্না। তার জীবনে মৃত্যু এতো নির্মমভাবে সবটা কেড়ে নেয় বারবার; প্রথমে কুসুম আর এবার তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন। কিন্তু একটা ব্যাপার ভেবে খটকা লাগে মনে- সেই রাতে ওই বাড়িতে রাত কাটালে, আজ স্বপ্নারও একই দশা হতো- ডাকাতদলের হাতেই তার মৃত্যু হয়তো অবধারিত ছিলো সেই রাতে।
ধনঞ্জয় বাবুরাও ব্যাপারটা শুনে বলবার মতো ভাষা খুঁজে পেলেন না। পাড়া প্রতিবেশী আশেপাশের সবাই ধনঞ্জয় বাবুর বাসায় ভিড় করেছে ঘটনাটা জানতে।
স্বপ্নার বেশ রাগ হলো কুসুমের ওপর। যখন মেয়েটা জানতোই এসব হবে, তখন স্বপ্নাকে একা না বাঁচিয়ে, তার শ্বশুরবাড়ির সবাইকে বাঁচাতে পারলো না সে? কুসুম যদি এই উপকারটুকু করতো, তবে হয়তো বিয়ের পরের দিনই অকাল বৈধব্য হতে হতোনা স্বপ্নাকে।
শ্রাদ্ধের কাজকর্ম মিটে গেলে, সময়ের সাথে সাথে এই ঘটনাটাও মানুষের মন থেকে মুছে গেলো। শুধু বাইরে বেরোলে, এখন কেউ কেউ স্বপ্নাকে দেখে আহা উহু করে সান্ত্বনা দেয়, আবার কেউ কেউ আড়ালে স্বপ্নাকেই দোষে-“মেয়েটাই অলক্ষ্মী, বুঝলে কীনা, নাহলে সেবার ভাদাভাদির সময় কুসুম, আর এবার পুরো শ্বশুরবাড়িকেই মরতে হয়? না না মেয়েটারই সমস্যা আছে বুঝলে…”
স্বপ্না উত্তর দেয় না। মুখ ঢেকে সরে পড়ে সে; আর মনে মনে কুসুমের ওপর চাপা একটা রাগ জমিয়ে রাখে।
একদিন দুপুরে খাওয়া দাওয়া সেরে রোদ পোহাচ্ছিলো দাওয়ায় বসে স্বপ্না। শীতের দুপুর, হাল্কা রোদ কুয়াশা আর শিরশিরে হাওয়া। যদিও ভাতঘুমের অবকাশ নেই। একটা গল্পের বই হাতে নিয়ে রোদে বসে বসে পড়ছিলো স্বপ্না। হঠাৎ একটা শব্দে মুখ তুলে তাকায় সে। দাওয়ায় ঠিক ওর সামনে সিড়িটায় বসে আছে কুসুম। সেই গোলগাল চেহারা, কাজল টানা চোখ, হাসি হাসি মুখের আদল, খোলা চুল। একদৃষ্টিতে স্বপ্নাকে দেখছে সে।
মুহুর্তে রাগে ঝাঁঝিয়ে ওঠে স্বপ্না-“তুই আবার এসেছিস? এবার কাকে কেড়ে নিবি? সব তো শেষ করেছিস! তবু শান্তি হয়নি তোর? আবার এসেছিস আমার ক্ষতি করতে!”
সিড়িতে বসে, মুচকি মুচকি হেসে শান্ত গলায় কুসুম উত্তর দেয়-“সে বছর ভাদাভাদির দিন ভোরবেলা আমার সাথে একটা ঘটনা ঘটেছিলো, সেটা কেউ জানতো না। আমাদের পাড়ার বুবাই দার সাথে আমার একটা সম্পর্ক ছিল সে কথা তো জানতি তুই; তোকে তো সবটা বলেছিলাম। একদিন বুবাই দার একটা গোপন ব্যাপার আমার কাছে ফাঁস হয়ে যায়। আমি জেনে যাই, আমি জানতে পারি বুবাই দা, বেআইনি নেশার জিনিসপত্র বর্ডার এলাকা থেকে লুকিয়ে এনে, চোরাপথে চালান করে। আমি অনেক বুঝিয়েছিলাম ওকে, এসব কাজ ছেড়ে দিতে বলেছিলাম, কিন্তু ও শোনেনি। ভাদাভাদি অনুষ্ঠানটার কিছুদিন আগে থেকেই এসব ব্যাপার নিয়ে আমাদের মধ্যে ঝামেলা চলছিলো। এসমস্ত ঘটনায় মন মেজাজ এমনিতেই খারাপ ছিল আমার। আমি বাধ্য হয়ে ওকে ভয় দেখাই যে, ও এসব কাজ না ছাড়লে আমি ওর বাসায় সবাইকে জানিয়ে দেবো। সেদিন অনুষ্ঠানের দিন সকালে আমাকে বুবাইদা দেখা করতে বলে। বলেছিল সব ঝামেলা ঝগড়া নাকি মিটিয়ে নেবে।
আমিও মানসিক দিক থেকে এতোটা ভেঙে পড়েছিলাম যে, আমিও ওর কথায় রাজী হয়ে সকালে দেখা করতে চলে গেলাম বাড়ির কাউকে কিছু না বলে। বুবাই দা আমাকে ওর কথার জালে ফাঁসিয়ে, আমাকে কিছু একটা খাইয়ে দেয়। বয়সটাও কম ছিলো তখন। ওতো খারাপ ভালো মাথায় ছিলো না। মানুষ আর মুখোশে ফারাক বুঝতে পারিনি তখন। বাসায় ফিরে কাউকে কিছু জানাইনি। কিছুক্ষণ পর থেকে শরীর খারাপ লাগতে শুরু করে। আমি ঘাবড়ে যাই; বুঝতে পারিনা কিছু যে কি করা উচিত আমার। বাসায় বকা খাওয়ার ভয়ে কাউকে ব্যাপারটা জানাতে পারিনি। বুবাই দা কী খাইয়েছিল সেটাও জানিনা। শুধু বুঝতে পারছিলাম ওটা খাওয়ার পর পরই শরীরটা খারাপ করছিল খুব।
যাই হোক, যখন আমরা দুজন দিঘিতে পান সুপারী হাতে নিয়ে তিন ডুব দিতে গেছিলাম, তখন প্রথম দুবার ডুব দেওয়ার পরই তৃতীয় বারের বার আর পায়ের ব্যালেন্স ঠিক রাখতে পারিনি। জলের ছোঁয়া লাগতেই শরীরে অস্বস্তিটা যেন আরও বেড়ে গেছিলো। মুহুর্তে যেন চারপাশটা অন্ধকার লাগা শুরু হলো, চারপাশের আওয়াজগুলো ঘোলাটে অস্পষ্ট লাগতে শুরু করলো; আর তারপর… সব শেষ। মারা গিয়েও শান্তি পাইনি আমি। অনেক বছর বাদে যখন তোর সম্বন্ধ এলো, আমি খবরটা যখন জানলাম, ততক্ষণে তোর বিয়ে হয়ে গেছে। পাত্রকে মুহুর্তের জন্য দেখে আমি অবাক। নিজের চোখে বিশ্বাস হচ্ছিলো না চোখের সামনে যা দেখছিলাম। সাথে একটা চাপা রাগ জমে উঠছিলো আমার মধ্যে।
এ তো সেই বুবাই দা; ভালো নাম অলোক রায়। ও সেদিন ঠান্ডা মাথায় প্ল্যান করে আমাকে খুন করেছিলো, যাতে সেটা আপাত দৃষ্টিতে দূর্ঘটনা মনে করে সবাই। যাতে খালি চোখে দেখতে লাগে- আমি পা হড়কে ডুবে। তাই এতো বছর পর যখন দেখলাম তুইও ওই হারামজাদা মিনসেটার জালে ফেঁসে যাচ্ছিস, নিজেকে শান্ত রাখতে পারিনি; তুই না আমার জন্মের সই… তোর ক্ষতি চোখের সামনে দেখতে পারি? এবার বল খুব ভুল করেছি কি কিছু আমি?”
স্বপ্না কিছু বলার জন্য মুখ তুলে তাকিয়ে দেখে কুসুম আর সেখানে নেই। শেষ দুপুরের রোদ এসে পড়েছে নিকনো উঠানে। আশপাশের বাতাসে কেমন একটা মিষ্টি মতোন গন্ধ ছড়ানো আছে; গন্ধটা স্বপ্নার যেন খুব চেনা; কেমন একটা চেনা মানুষের গায়ের গন্ধ।
স্বপ্নার চোখ ছলছল করে উঠলো। গাল বেয়ে নেমে এলো ফোঁটা ফোঁটা জল; মুখ দিয়ে কান্নার আওয়াজ বেরোলো না। কিন্তু বুক চাপা একটা কষ্ট যেন আঁকড়ে নিলো ওকে৷ বলার মতো কিই বা আছে? কুসুমের শেষ কথাটা কানে ভেসে উঠলো ওর-
“তুই না আমার জন্মের সই…”।


এ জাতীয় আরো ..