দৃষ্টিভঙ্গি

WriterBD / ৭৯ বার পঠিত
আপডেট : বুধবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০২১
Picture- Google

Writer || Mahmuda Sultana

– বিয়ের ১ মাস পর নীহানাকে রেখে বিদেশে চলে গিয়েছিলাম। ১ মাসে নীহানার লজ্জা এতটুকুও কমেনি। খুব আড়ষ্ট হয়েই ছিল সবসময়। বিদেশে আসার পর আমদের ফোনে কথা বলা, একে অপরের সম্পর্কে জানা , নিজেদের ভাব বিনিময় করা ও ভালোবাসা তৈরি হয়। দেশে ফিরে আমরা কি করবো, আমাদের সময়গুলো কিভাবে কাটাবো দুজনে তার স্বপ্ন দেখতাম। আমি এখন আমাদের স্বপ্ন পূরণের দিকে আসছি। ৫ বছর পর বিদেশ থেকে আজ দেশে ফিরলাম। কতদিন পর আপন মানুষগুলোর মুখ দেখতে পাবো।

ভিডিও দেখতে ক্লিক করুন

– বিদেশ থেকে আসার সময় নীহানা যা পছন্দ করে, ওর শখের সব জিনিস নিয়েছি। মায়ের জন্য শাড়ি, ছোট ভাই রীনের জন্য ল্যাপটপ। আমি দেশে ফিরবো তা বাড়িতে জানে কিন্তু আজই যে ফিরবো তা বাড়িতে জানাইনি। সবাই অবাক হয়ে যাবে। নীহানার সাথে দুইদিন থেকে ফোনেও কথা বলিনি যাতে ও একটু অভিমান করে আর আমি সশরীরে ওর সামনে যখন উপস্থিত হবো, তখন দেখবো ও কতটা অভিমান করে থাকতে পারে।

– আর কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়িতে ফিরব। আচ্ছা আমি বাড়িতে ফেরার পর কি কি হবে? নিশ্চয়ই মা আমাকে জড়িয়ে ধরে বলবে এতদিন পর আমার কলিজাটা ঠান্ডা হল। তুই এত শুকিয়ে গেছিস বাবা? মাকে নিয়ে আর পারা যায় না, আমি যতই স্বাস্থ্যবান হই না কেন, আমি বাড়িতে ফেরার পর মা অবশ্যই এই কথাটাই বলবে। মায়ের ধারণা তার চোখের আড়াল হলেই আমি শুকিয়ে যাই। আর রীন ছুটে এসে বলবে, ভাইয়া আমার জন্য নিশ্চয়ই ল্যাপটপ এনেছ? আর নীহানা কি করবে? ও কি আগের মতো আমার সামনে আসতে লজ্জা পাবে, নাকি ঘোমটার আড়াল থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে আমায় দেখবে?

– উফ আর ভাবতে পারছি না। বাড়িতে পৌঁছাতে আর মাত্র ৩০ মিনিট বাকি। এতদূর পথ কিছু মনে হয়নি, অথচ আর এই ৩০ মিনিট অনেক সময় মনে হচ্ছে। বাড়িতে ফিরে প্রথমেই মাকে জড়িয়ে ধরে জিঙ্গাসা করলাম কেমন আছো? মা আমাকে পেয়ে আবেগে কেঁদে ফেললেন। রীন এসে ভাইয়া বলে চিৎকার করে জড়িয়ে ধরলো। দুজনেই বেশ অবাক হয়েছে।

– মা, নীহানা কোথায়? মা কিছু না বলে বললেন, বাবা তুই অনেক জার্নি করে এসেছিস ঘরে যা বিশ্রাম নে। ঘরে যাচ্ছি আর ভাবছি আমি প্রথমেই গিয়ে নীহানাকে জড়িয়ে ধরবো আর খুশিতে নীহানা কেঁদে ফেলবে। কিন্তু আমি ঘরে এসে অবাক। নীহানা ঘরে নেই। নীহানা কি আমি আসার খবর পেয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গিয়েছে? তা তো হওয়ার কথা নয়। দেখি বাইরে কোথাও আছে কি না। কিন্তু কোথাও নীহানাকে পাচ্ছি না। অবশেষে মাকে ডাকলাম, মা নীহানা কোথায়? মায়ের মুখটা পাংশুবর্ণ হয়ে গেল। মা বললেন, কাল থেকে নীহানাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমি ও রীন পুরো বাড়ির কোথাও নীহানাকে খুঁজে পাইনি। আশপাশের বাড়ি, নীহানার বাবার বাড়ি কোথাও নীহানা নেই। তোকে জানালে তুই দুশ্চিন্তা করবি এজন্য তোকে জানাইনি। ভেবেছিলাম বৌমাকে পাওয়া যাবে। আমি বাড়িতে আসার পর আবার নতুন করে নীহানাকে খুঁজলাম। যেখানে যেখানে নীহানা যেতে পারে, সব আত্মীয়ের বাড়িতেই খোঁজা হল। কিন্তু নীহানা কোথাও নেই।

– কিছু প্রতিবেশি মন্তব্য করতে লাগলো, স্বামী এতদিন বিদেশে ছিল, এদিকে সুন্দরী কচি বউয়ের নিশ্চয়ই পরোকীয়া ছিল। তাই স্বামী ফিরে আসার খবর শুনে পালিয়ে গেছে। প্রতিবেশিদের এসব কথা আমি বিশ্বাস করতাম না। মনে হতো নীহানা কখনই এই কাজ করতে পারে না। সময় চলে যাচ্ছে কিন্তু নীহানার কোন খোঁজই পাওয়া যাচ্ছে না। ইদানিং মাও প্রতিবেশিদের এসব কথা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। মা আমাকে নানা ভাবে সান্ত্বনা দিতে লাগলো, নীহানা তো চলে গেছে বাবা, তুই ওকে ভুলে যা।

– কিন্তু মাকে আমি কিভাবে বুঝাই আমি নীহানাকে কতটা ভালোবাসি। ওকে আমি কিভাবে ভুলে যাবো। নীহানা যে আমার কাছে মায়াবী এক নতুন পৃথিবী নিয়ে ধরা দিয়েছিল। সারাক্ষণই নীহানার কথা মনে হয়। আসলে কোথায় যেতে পারে মেয়েটা? আমি আমার রুমে প্রবেশ করলেই কষ্টের ফোয়ারা ওঠে যেখানে নীহানা আর আমার প্রথম রাত ছিল, যেখান ওর হাতে হাত রেখে কথা দিয়েছি, সারাটা জীবন তোমাকে ভালো রাখার দায়িত্ব আমার।

– মা চাচ্ছেন আমি আবারও বিয়ে করি। আমি আর বিয়ে করবো না বলার পরেও মা তা মানছেন না। মা আমাকে আর এত কষ্টের মধ্যে দেখতে পারছেন না। তার ধারণা আমার বিয়ে হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। ছোটবেলায় বাবা মারা যাওয়ার পর মা আমাকে আর রীনকে বুকে নিয়ে অনেক লড়াই করছেন। নিকট আত্মীয় থেকে শুরু করে সমাজের বিরুদ্ধে। নিষ্ঠুর আমাদের সমাজ, যেখানে দূর্বলের উপর সবলের অত্যাচার, যেখানে অসহায়ের প্রতি সহায় না হয়ে সুযোগ নেয়ার প্রতিযোগিতা প্রতিনিয়ত চলে। সেখানে দাঁতে দাঁত চেপে মা লড়াই করেছেন। আমরা দুইভাই ঠিক করেছি মাকে আমরা কখনই কষ্ট পেতে দিবো না।

– মা একদিন আমার সামনে এসে করুণ কন্ঠে বলেন, বাবা আর একটা বিয়ে কর। আমার তো বয়স হয়ে যাচ্ছে। এই সংসার সামলানোর জন্য তো একটা বউ দরকার। আমারও তো নাতি নাতনি দেখতে ইচ্ছা করে। সেদিন মায়ের মুখের দিকে চেয়ে আমি আর না করতে পারিনি।

– মা পাত্রী দেখেছেন, বিয়ের তোড়জোড় চলছে। কাল বিয়ে। অনেক আত্মীয় এসেছে। আমার দাদার সময়ে জাহাজের ব্যবহৃত ভারী মোটা স্টীল দিয়ে বড় করে সিন্দুক বানানো হয়েছে। সিন্দুকে কোন জিনিস রাখতে বা বের করতে সিন্দুকের ঢাকনা তুলে ভিতরে প্রবেশ করতে হয়। যেখানে আগে অনেক গুরুত্বপূর্ণ জিনিস রাখা হত। এখন সিন্দুকটা স্টোর রুমে রাখা হয়েছে। সেই ঘরে সচরাচর যাওয়া হয় না। বাড়িতে কোন অনুষ্ঠান হলে সেখান থেকে জিনিসপত্র বের করা হয় আবার অনুষ্ঠান শেষ হলে রেখে দেয়া হয়। বিয়ের আগের দিন স্টোর রুমে সিন্দুক থেকে জিনিস আনতে গিয়ে মা চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। মায়ের চিৎকারে বিয়ে উপলক্ষে আগত সব অতিথি স্টোর রুমে চলে আসে। আমি প্রথমেই গিয়ে মাকে ধরি। কিন্তু স্টোর রুমে গিয়ে বোটকা গন্ধে বমি আসার উপক্রম। একটা গলিত মৃতদেহ সিন্দুকে। সেখান থেকেই এই গন্ধ আসছে। এই খবরে আমাদের বাড়িতে মানুষজনে ভরে যায়। পুলিশ আসে, ময়নাতদন্তের জন্য মৃতদেহটা নিয়ে যায়।

– অবশেষে জানা যায় লাশটা নীহানার। মায়ের জ্ঞান ফেরার পর মাকে জিঙ্গাসা করি, নীহানা কিভাবে সিন্দুকের ভেতর আটকা পড়লো? নিখোঁজ হওয়ার আগে তোমার সাথে কি কথা হয়েছে? মা বলেন…

মাঃ তুই যেদিন বাড়িতে আসছিস তার একদিন আগেও বৌমার সাথে আমার কথা হয়। বৌমা অনেক হাসিখুশি ছিল তুই আসবি বলে। আমার কাছে বৌমা জানতে চায় তোর প্রিয় জিনিস সম্পর্কে। আমি তোর প্রিয় জিনিস গুলোর কথা বলি, সেই সাথে তোর দাদুর দেয়া আতর দানির কথা বলি। যেটা তোর দাদু হজ্জ করতে গিয়ে নিয়ে আসে। আতরদানিটা তোর খুব প্রিয় ছিল। তোর দাদু মারা যাবার পর তার চিহ্ন হিসেবে তুই ওই আতরদানিটা খুব যত্ন করে রাখতি,তোর দাদির দেয়া স্বর্ণের চেইন, তোর ছোটবেলার খেলার অনেক জিনিস যেগুলো স্টোর রুমের সিন্দুকে রাখা আছে। আমি এসব বৌমাকে বলি। তাহলে কি বৌমা এসব জিনিস দেখার জন্য কৌতূহলী হয়েছিল? আর সেগুলো দেখার জন্য একাই সিন্দুকে প্রবেশ করে। উপরের ঢাকনা তুলে সিন্দুকে প্রবেশ করার পর ঢাকনাটা কোনো ভাবে সিন্দুকে পড়ে গিয়েছে। আর ঢাকনাটা আটকে গেছে যেটা আর ভেতর থেকে কোনোভাবে খুলতে পারেনি। সিন্দুকে বন্ধ অবস্থায় কেউ আটকা পড়লে, ভিতর থেকে ডাকলেও বাইরে থেকে তা শোনা যাবে না। হায়! হায়! বৌমা তো আমাকে বলতে পারতো তাহলে আমি সাথে নিয়ে গিয়ে দেখাতাম। তাহলে আর এই দূর্ঘটনা ঘটতো না।

– হায় আল্লাহ,একি হল। আমি আর কিছুই ভাবতে পারছি না। আমার নীহানা সিন্দুকে আটকা পড়ে না জানি কতটা কষ্ট পেয়েছে। বাঁচার জন্য কত আকুতি করেছে। নিঃশ্বাস নেয়ার জন্য কত চেষ্টাই না করেছে। আর মানুষ তাকে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে । বর্তমানে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিটাই এমন হয়েছে যে, আমরা কোনো কিছু আলোচনার সুযোগ পেলেই নেতিবাচক ভাবে ভাবতে থাকি। অন্যের নামে কুৎসা রটনা করে গালগল্প তৈরি করতেই আমাদের বেশি ভালোলাগে। আমাদের উচিত চিন্তাধারাকে এত ছোট না রেখে প্রসারণ করা।


এ জাতীয় আরো ..